logo
রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৫

  যাযাদি রিপোর্ট   ১৫ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

বাবুল চিশতীর পেটে ফারমার্সের ১৮০০ কোটি টাকা

বাবুল চিশতীর পেটে ফারমার্সের ১৮০০ কোটি টাকা
মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতী
মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতী। আর্থিক খাতের জাল-জালিয়াতিতে জড়িত বহুল আলোচিত নাম। তিনি ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে কৌশলে প্রায় ১৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ২০১৫ সালে পাঁচটি ঋণে বড় জালিয়াতির তথ্য ফাঁসের পর তাকে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমান পদ্মা ব্যাংক) সব পদ ছাড়তে হয়। এরপর কয়েক বছরে প্রায় এক ডজন মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

সম্প্রতি অবৈধ সম্পদ অর্জনের আরও একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে দুদকের তদন্তে বাবুল চিশতী ও তার স্বজনদের নামে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে। যেখানে জমির দাম শায়েস্তা খানের আমলের চেয়েও কম দাম দেখানো হয়েছে! এভাবে জালিয়াতি করেছেন অর্থের জোরে যুদ্ধাপরাধী থেকে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠা বাবুল চিশতী।

দুর্নীতি দমন কমিশনে তথ্যানুসারে, তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে ত্রিশ হাজার শতক জমি মাত্র চার টাকা দরে কিনেছেন। সংস্থাটির তদন্তে জালিয়াতির এ তথ্য উঠে এসেছে। এভাবে মূলত সম্পদের তথ্য গোপনের চেষ্টা করেছেন তিনি। দুদকে দেওয়া সম্পদের বিবরণীতে প্রায় ৬৫ বিঘা জমির ক্রয়মূল্য ৩৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা দেখিয়েছেন বাবুল চিশতী। নিজ উপজেলা বকশীগঞ্জের গোলগাঁও মৌজায় এক শতক জমির ক্রয়মূল্য চার টাকা বলে দাবি করেছেন তিনি। একইভাবে পলাশতলা মৌজায় ১৫ শতক জমি মাত্র ২২৯ টাকায় কিনেছেন বলে তথ্য দিয়েছেন। এ হিসেবে প্রতি শতক জমির দাম পড়ে ১৫ টাকা। এছাড়া কামালপুর মৌজায় সাত হাজার ৩২ টাকায় বাবুল চিশতী কিনেছেন ৫৮ শতক জমি। এখানে প্রতি শতক জমির দাম পড়েছে ১২১ টাকা।

বাবুল চিশতী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৩২৬ বিঘা জমির সন্ধান পেয়েছে দুদক। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু জালিয়াতি করে জমির দাম কমিয়ে দেখানো হয়েছে। বর্তমান বাজার দরে ওই এলাকায় প্রতি শতক জমির দাম গড়ে ৩০ হাজার টাকা হলেও ক্ষেত্রবিশেষ এক শতক জমির দাম চার টাকাও দেখিয়েছে চিশতী।

অন্যদিকে, ফারমার্স ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক বাবুল চিশতী অনিয়ম-জালিয়াতির মাধ্যমে অর্ধশত প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন। ওই ঋণের বড় অঙ্কই পরবর্তীতে বাবুল চিশতীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। এভাবে নিজে হস্তক্ষেপ করে অনিয়মের ঋণের মাধ্যমে প্রায় ১৮০০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর জালিয়াতির ঋণগুলো খেলাপি হয়ে পড়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখার গ্রাহক মেসার্স অ্যামারেল্ড ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারহানা আল আজাদকে ১২ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়। ব্যাংকটির তৎকালীন অডিট কমিটির চেয়ারম্যান বাবুল চিশতী সরাসরি সুপারিশ করে ওই ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন। যদিও ওই মেমোতে 'ঋণের বিপরীতে অপর্যাপ্ত জামানত রয়েছে' বলে উলেস্নখ করেছিলেন ব্যাংকটির তৎকালীন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীম। এরপরও নিয়ম-কানুন ভেঙে ওই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে সুদসহ মন্দঋণ হিসেবে চিহ্নিত ওই খেলাপি ঋণের অঙ্ক প্রায় ১৯ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ঋণ নিলেও গ্রাহক কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি।

শুধু অ্যামারেল্ড ফুডস লিমিটেড নয়। প্রায় অর্ধশত কোম্পানিকে নিয়ম ভেঙে ঋণ পাইয়ে দিয়েছেন বাবুল চিশতী। তালিকায় অ্যাটলাস গ্রিনপ্যাক লিমিটেড, শীতল এন্টারপ্রাইজ, জেসিকা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রোজবার্গ অটোব্রিক মিলস, শাবিজ ইন্টারন্যাশনাল, হিরা ইলেকট্রনিক্স, চিটাগাং ফ্যাশন টেকনোলজি লিমিটেড, রংপুর জুট মিলস, অ্যাপোলো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও ইসমাইল রাইস মিলসহ ৫০টি কোম্পানির নাম রয়েছে। এসব কোম্পানিকে ঋণ দিতে প্রভাব খাটিয়েছেন বাবুল চিশতী। ঋণের উলেস্নখযোগ্য অংশ-ই পরে বাবুল চিশতীর পকেটে গেছে বলেও তথ্য মিলেছে। ঋণ জালিয়াতির কারণে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক হাজার ৮১৯ কোটি ৫৯ লাখ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামভিত্তিক সাইফ পাওয়ারটেক, খুলনার ইউনাইটেড ব্রিকস ও ফুলতলা ফিলিং স্টেশন, রুট টু মার্কেট ইন্টান্যাশনাল, আরবার ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড এবং চিটাগাং ফিশারিজ নামের প্রতিষ্ঠানকে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ পাইয়ে দিয়ে বিপাকে পড়েছেন বাবুল চিশতী। ওই তদন্তে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ প্রদান, ঋণের অর্থ ভিন্নখাতে ব্যয়ের সুযোগ করে দেওয়া ও ঋণ প্রদানে বিদ্যমান নিয়ম ভঙ্গের তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ প্রতিবেদনে ওই ঋণগুলোর অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়। অন্যদিকে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করার কারণে ওই ঋণগুলোও খেলাপি হয়ে পড়েছে। এমন অভিযোগের জের ধরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে বাবুল চিশতীকে পদ ছেড়ে দিতে হয়েছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, অবৈধভাবে বাবুল চিশতী প্রায় ২৮ কোটি ৫৫ লাখ, তার স্ত্রী রোজি চিশতী প্রায় ৩৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, শ্যালক মোস্তফা কামাল প্রায় ৮৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা, ছেলে রাশেদুল হক চিশতী প্রায় ৩২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, ছেলের স্ত্রী ফারহানা আহমেদ প্রায় ১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ও কলেজপড়ুয়া মেয়ে রিমি চিশতী প্রায় ২১ কোটি ২০ লাখ টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে তথ্য মিলেছে। কিন্তু বাবুল চিশতী, তার স্ত্রী রোজি চিশতী ও শ্যালক মোস্তফা কামালসহ তার পরিবারের সদস্যরা ওই সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।

এদিকে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি সময়ে বাবুল চিশতীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৪৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। জালিয়াতির অর্থে ঢাকা ও জামালপুরে ৩৮টি জমি কিনেছেন বাবুল চিশতী। ফারমার্স ব্যাংকসহ চারটি কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন। নিজ ও প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তত ২৮টি ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। অন্যদিকে অবৈধ আয়ের অর্থে ময়মনসিংহ সদর, রাজধানীর গুলশান ও মহাখালীর ডিওএইচএসের মতো অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন। জামালপুরের বিভিন্ন স্থানে জমি কিনেছেন। তার নামেও অন্তত চারটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনা হয়েছে। বাবুল চিশতী ও তার স্বজনদের নামে-বেনামে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার সম্পদের হদিস মিলেছে।

এদিকে, অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাবুল চিশতী এবং তার পরিবার-স্বজনদের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরমধ্যে মানি লন্ডারিংরে মাধ্যমে ১৫৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ২০১৮ সালে গুলশান থানায় দায়ের করা দুদকের মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। ওই মামলায় বাবুল চিশতী, ছেলে রাশেদুল হক চিশতী ও স্ত্রী রোজি চিশতীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, জাল-জালিয়াতি, বিদেশে অর্থ পাচার ও সম্পদের তথ্য গোপনসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বাবুল চিশতীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সাল থেকে অদ্যাবধি ১১টি মামলা করেছে দুদক। মামলাগুলোতে অন্যদের মধ্যে বাবুল চিশতীর মেয়ে রেশি চিশতী, ভাই মাজেদুল হক চিশতী, ভাগ্নে মোস্তফা কামাল, ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোস্তাক আহমেদ, চট্টগ্রামভিত্তিক এসএ গ্রম্নপের কর্ণধার শাহাবুদ্দিন আলম ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন আলমসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ওই ১১ মামলায় প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনেছে দুদক।

অন্যদিকে, ১৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের পাঁচ মামলায় ফারমার্স ব্যাংক (পদ্মা ব্যাংক) কেলেঙ্কারির হোতা মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গত রোববার ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ কে এম ইমরুল কায়েশ দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

তথ্যমতে, গত ২৫ ফেব্রম্নয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল মামলাগুলোতে পদ্মা ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান বাবুল চিশতীকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। ওই দিন বিচারক আসামির উপস্থিতিতে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে শুনানির জন্য ৮ মার্চ দিন রাখেন। গত রোববার বাবুল চিশতীকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করে।

এর আগে, গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয় ১-এ মোহাম্মদ ফয়সাল বাদী হয়ে বাবুল চিশতী ও তার পরিবারের চার সদস্যের বিরুদ্ধে পৃথক পাঁচটি মামলা দায়ের করেন। ওই পাঁচটি মামলায়ই আসামি বাবুল চিশতী। মামলাগুলোতে বাবুল চিশতীর সঙ্গে তার স্ত্রী মোছা. রোজি চিশতী, ছেলে রাশেদুল হক চিশতী, ছেলের স্ত্রী ফারহানা আহমেদ ও তার মেয়ে রিমি চিশতীকে আসামি করা হয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে