সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
walton

কেমন গল্প-আড্ডা চাই যবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা?

যবিপ্রবি প্রতিনিধি
  ২৩ মার্চ ২০২৩, ১৮:১১

বিশ্ববিদ্যালয়ের টানা ক্লাস- ল্যাব, এসাইনমেন্ট-প্রেজেন্টেশন এর বিরক্তি শেষে বন্ধুদের সাথে গল্প- আড্ডা যেন প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরিয়ে দেয়। সুখ-দূঃখ ও স্কুল-কলেজের স্মরণীয় ঘটনা শেয়ার করা, হাসি-তামাশা, গান-নাচ, কবিতা, ছোট্টবেলার বিভিন্ন খেলা প্রভৃতি আড্ডাগুলোকে করে আরও প্রাণবন্ত। ক্যাম্পাস জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ গল্প-আড্ডা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিময় হয়ে থাকে এ-ই গল্প-আড্ডাগুলো।

অনলাইন দুনিয়ার কবলে শিক্ষার্থীদের আড্ডাগুলো দিন দিন কমে যাচ্ছে। আবার কিছু কিছু আড্ডাখানাতে ঘটেছে বিকৃতি। হারিয়ে গেছে সাংস্কৃতিক আড্ডাগুলো।

পুরনো সেই আড্ডাগুলোতে ফিরে যেতে চায় শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রত্যাশা যেখানে থাকবে বিনোদনমূলক গল্প-আড্ডার পাশাপাশি একটু ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন। আড্ডাগুলোর মাধ্যমে শিখবে নতুন কিছু। মনের মধ্যে উঁকি দেওয়া বৈজ্ঞানিক ভাবনাগুলো শেয়ার করবে বন্ধুদের মাঝে। কল্পিত সমস্যাগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান খুজবে বন্ধুরা মিলে। ফাঁকে ফাঁকে হয়ে যাবে খুনসুটি। অনলাইন দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা যুক্ত হবে গল্প- আড্ডায়। জমে উঠবে গাছতলায় বসে গল্পগুলো। বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রাক্তনগণ আর আক্ষেপ করবে না আমাদের সময়ের আড্ডাগুলো ক্যাম্পাসে আর দেখিনা!

ক্যাম্পাসে কেমন আড্ডা চান যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা সে-সম্পর্কে লিখেছেন যবিপ্রবির শেখ সাদী।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান বলেন, ৩৫ একরের ক্যাম্পাস। প্রাণের যবিপ্রবি যেনো বড় বড় বিল্ডিংয়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। আড্ডা দেওয়ার মতো তেমন কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। তবুও যখনই আমরা আড্ডা দেই, সেই গল্প-আড্ডাগুলোতে সুখ-দুঃখের কথা, জীবনের স্মৃতিগুলো শেয়ার করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা আরও বৃদ্ধি পাক সেই প্রত্যাশা করি। আড্ডাগুলো হোক নিজেদের জ্ঞান বন্ধুদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার।

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ফিশারীজ এন্ড মেরীন বায়োসাইন্স বিভাগের সালেহীন আদিব বলেন, আধুনিকতার এই যুগে এসে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বন্ধু বান্ধবের আড্ডায় বেশিরভাগই এখন ব্যাস্ত থাকে নেশা জাতীয় দ্রব্যে। আড্ডার মুল বিষয় থাকে ফেসবুকে ভাইরাল একদম নতুন কোন টপিক। অধিকাংশ সময়ই সেই আড্ডার মুল বিষয়বস্তু থাকে মেয়ে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আড্ডা বিষয়বস্ত হওয়া উচিত ছিল গবেষণামূলক, দেশাত্মবোধক চিন্তাভাবনা, নিজেদের কিভাবে প্রতিনিয়ত আরো উন্নত করা যায় সে বিষয়ক। অনলাইনে নেতিবাচক বিষয় নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি ইতিবাচক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের বেশি মনোযোগ বাড়াতে হবে। অনলাইন থেকে নির্ভরতা কমানোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন ব্যাক্তি উদ্যোগ, সেখান থেকে সে তার নিকট বন্ধু এবং পরিশেষে সেই আড্ডার পরিবেশ পরিবর্তন করতে পারবে।

২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান জানান, অনলাইন দুনিয়ার মোহে ক্যাম্পাসের আড্ডাগুলো হারিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্লাবের সাথে যুক্ত থাকার মাধ্যমে নিজেকে অনেক বেশি প্রোডাক্টিভ ও ব্যস্ত রাখা যায়। একই সাথে মোবাইল ফোনের আসক্তি থেকেও নিজেকে দূরে রাখা যায়। একই সাথে একটি প্রানবন্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, দেশের প্রায় সব ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীদের আড্ডায় পর্ণগ্রাফি আলোচনা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। কিছু কিছু আড্ডাখানাতে পর্ণগ্রাফির অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করা হয়। মনে হবে, যেন এখানে পর্ণগ্রাফি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে আরও আলোচনা হচ্ছে মেয়েদের নিয়ে অনেক অশ্লীল কথাবার্তা। গর্হিত কথাবার্তায় আজ ছেয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের আড্ডাখানাতে। আড্ডাখানাতে এই ধরনের সমাজবিরোধী আলোচনা থেকে আমাদের বের হয়ে আসা উচিত। আমাদের আড্ডাগুলো বিনোদনের পাশাপাশি দেশ ও জাতির কল্যাণে হোক।

কেমন হয় যদি আমরা আমাদের গল্প-আড্ডাগুলোকে বিনোদনের পাশাপাশি নতুন কিছু আবিষ্কারের ভাবনাগুলো বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করার। বা দেশকে নতুন কিছু দেওয়ার ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দেয় বন্ধুদের মাঝে। যেমন মনের মধ্যে আসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধরনের চিন্তা-কল্পনা বাস্তব রুপ প্রদানে কাজ করা, গল্প-আর্টিকেল লেখা, বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠন তৈরি করে সমাজের অসংগতি গুলো দূর করা , জনগণের আশা-আকাঙ্কা গুলো পূরণ করতে নেতৃত্ব দেওয়া প্রভৃতি। শিক্ষার্থীদের অবসর সময়গুলোকে আরও গতিশীল করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় দুটি কাজ করতে পারে। যেমন

প্রথমত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-গবেষণায় অনুপ্রেরণা ও সংযুক্তির জন্য দ্বিমাসিক বা ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করা যেতে পারে। এই ম্যাগাজিনে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা তাদের মনের মধ্যে উঁকি দেওয়া আবিষ্কারের চিন্তা-ভাবনাগুলো গল্প আকারে প্রকাশ করতে পারবে। ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আইডিয়া গুলোর সেরা বাছাই করে প্রথম এক থেকে দশ সংখ্যা পর্যন্ত পুরস্কৃত করে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা যায়। আবার এখান থেকে বাছাইকৃত প্রথম তিনজনের আইডিয়াগুলো জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করলে এতে প্রতিযোগিতা আরও বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে আরেকটি অংশ যোগ করা যায়, স্কুল-কলেজের মতো ষান্মাসিক/বাৎসরিক বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। এই মেলায় শিক্ষার্থীরা তাদের বাস্তব জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে।

দ্বিতীয়ত ক্লাব- সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামাজিক কাজে দেশ ও জাতির কল্যাণে নেতৃত্ব উপযোগী করে গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে ক্লাব-সংগঠনের কাজের সক্রিয়তার ভিত্তিতে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করলে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয়ে অযথা গল্প-আড্ডা ও অনলাইন থেকে বিরত থেকে প্রডাক্টিভ শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলতে পারবে।

ফিরে আসুক সাংস্কৃতিক আড্ডাগুলো। স্মৃতিময় হয়ে থাকুক ক্যাম্পাসের গল্প-আড্ডাগুলো। শিক্ষার্থীদের আড্ডাগুলো জমে উঠুক নিত্য-নতুন আবিষ্কারের নেশায়। দেশ গড়ার নব-চেতনায় ভরে উঠুক জীবনের গল্পগুলো।

লেখক: শেখ সাদী, শিক্ষার্থী ও সাংবাধিক, ফিশারীজ এন্ড মেরীন বায়োসাইন্স বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যাযাদি/ এম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে