চাঙ্গাভাব ধরে রাখার পরিকল্পনা বিএনপির

জেল-জুলুম-হুলিয়ার ভয় না করেও ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বেশ কিছু কর্মসূচি সফল করায় পরবর্তীতে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন সফল করার বিষয়ে আশাবাদী দলটির হাইকমান্ড
চাঙ্গাভাব ধরে রাখার পরিকল্পনা বিএনপির

দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে পাঠানোর দাবিতে জেলা সমাবেশের সফল কর্মসূচির কারণে দেশব্যাপী বিএনপির নেতাকর্মীরা গত এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাঙ্গা। জেল-জুলুম-হুলিয়ার ভয় না করেও ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বেশ কিছু কর্মসূচি সফল করায় পরবর্তীতে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন সফল করার বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন দলটির হাইকমান্ড। মহামারির কারণে কর্মসূচি বন্ধ করা হলেও দলের চাঙ্গাভাব ধরে রাখতে চায় দলটি। এ জন্য আলোচনা সভা, মানববন্ধনের মতো নিরীহ গোছের কর্মসূচি প্রতিদিনই পালন করা হচ্ছে। পাশাপশি যতটা সম্ভব দল পুনর্গঠনের কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে। গত দেড় দশকের বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমের ইতিহাস সংক্ষেপে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৬ সালে ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার পর বিএনপি আন্দোলন নির্বাচন কোনোটাতেই সুবিধা করতে পারেনি। ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলা-জেল-জরিমানায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ে ছিল বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের আসনে বসতে হয়েছিল বিএনপিকে। বিশাল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পুরো মেয়াদে একটি বারের জন্য বেকায়দায় ফেলতে পারেনি দলটি। ফলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের প্রধান দাবি আদায়ের আন্দোলনেও তারা ছিল ব্যর্থ। এ ছাড়া ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ওই সময় সারাদেশে সরকার-বিরোধী কঠোর আন্দোলন করে দলটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দাবি আদায় করা সম্ভব হয়নি। ওই আন্দোলনে লাখ লাখ নেতাকর্মীর নামে মামলা দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় নেতাসহ গ্রেপ্তার হন অনেকে। সাংগঠনিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে বিএনপি। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে বারবার উদ্যোগ নিয়েও সফল হয়নি। সরকারের কঠোরতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দলে গতি ফেরাতেও সফল হয়নি দলটি। একের পর এক আন্দোলনের ডাক দিয়ে ব্যর্থ হয়। আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা রাজপথের পরিবর্তে নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন। ফলে হতাশ হন তৃণমূল নেতাকর্মীরাও। বিভিন্ন ইসু্যতে কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে বাড়তে থাকে দূরত্ব। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চরম ভরাডুবির পর নেতাকর্মীরা আরও হতাশ হয়ে পড়েন। এর আগে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলেও এর প্রতিবাদে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। হতাশায় নিমজ্জিত নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। প্রায় দেড় দশক ধরে এভাবেই চলে আসছে দলটির কার্যক্রম। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে পাঠানোর দাবিতে জেলা সমাবেশগুলোতে বিএনপির ভিন্ন চেহারা দেখা গেছে। এই কর্মসূচিগুলোতে উজ্জীবিত ছিলেন দলের নেতাকর্মীরা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সৃষ্টি হয়েছে চাঙ্গাভাব। দীর্ঘদিন ধরে হতাশায় নিমজ্জিত নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীরা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন হয়েছে অনেক স্থানে। পদবঞ্চিতরাও এসব কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে। দলের এই চাঙ্গাভাব দেখে আন্দোলন আরও বেগবান করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে গত ১৩ জানুয়ারি থেকে মহামারির কারণে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে সরকারের নিষেধাজ্ঞায় বিএনপি সময় পুনর্নির্ধারণের ঘোষণা দিয়ে আপাতত সমাবেশ কর্মসূচি স্থগিত রেখেছে। বিএনপি সূত্র মতে, দলের চাঙ্গাভাব অব্যাহত রাখতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অনেক নেতাকর্মী হাইকমান্ডকে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্য চাপ দিয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার বিষয়ে ভাবাও হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দফা যথার্থ পরিকল্পনার অভাবে আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার বিষয় বিবেচনা করে আর হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না দলের নীতি-নির্ধারকরা। তবে দলের চাঙ্গাভাব ধরে রাখতে ভিন্ন ছকে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আলাপকালে দলের সিনিয়র একাধিক নেতা জানান, চলমান বিধিনিষেধ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অগণতান্ত্রিক ও দমনমূলক। এরপরও জনস্বার্থ এবং প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে সমাবেশের সময় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিএনপির কার্যক্রম বন্ধ নেই। আলোচনা সভা ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা নেতাকর্মীদের আগামীর বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন। চলছে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কার্যক্রম, থেমে নেই কূটনৈতিক তৎপরতাও। নেতাদের মতে, দলের নেতাকর্মীরা জেগে উঠেছে। বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কর্মসূচি সফল করার সক্ষমতা বিএনপির তৈরি হয়েছে। এরপরও এবার পরিকল্পিত কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমে সফল হওয়ার সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে হঠকারি কোনো সিদ্ধান্তে বিএনপি যায়নি। সূত্র মতে, নিরীহ গোছের কর্মসূচির বাইরে আগামী মার্চের মধ্যে বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি করতে চায় বিএনপি। মহামারির মধ্যে যতটা সম্ভব কমিটি গঠনের কাজ করে যাওয়ার বার্তাও দেওয়া হয়েছে। চলছে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। পাশাপাশি দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকেও ঢেলে সাজানোর কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। দ্রম্নত সময়ের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দেওয়া হবে। সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের চাপে রাখতে মানবাধিকার পরিস্থিতিসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের অনিয়মের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহেরও কাজ শুরু করছেন বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। 'ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহে অনিয়ম-দুর্নীতি, লুটপাটের' তথ্যনির্ভর বাস্তবচিত্র জনগণের সামনে উপস্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিএনপির পরবর্তী কার্যক্রম প্রসঙ্গে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যায়যায়দিনকে বলেন, বিএনপির জনস্রোতে ভয় পেয়ে সরকার করোনা বৃদ্ধির নামে 'বিধি-নিষেধ' জারি করেছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে করণীয় বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

ক্যাম্পাস
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
হাট্টি মা টিম টিম
কৃষি ও সম্ভাবনা
রঙ বেরঙ

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে