logo
রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৫ আশ্বিন ১৪২৭

  সালাম সালেহ উদদীন   ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হোক নতুন বছর

আমরা গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার কথা বলি, কিন্তু গণতন্ত্র চর্চা করি না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি গণতন্ত্রচর্চা না থাকে, তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে কী করে। প্রত্যাশা করছি, নতুন বছর হোক গণতন্ত্র চর্চার বছর, অর্থনৈতিক উন্নয়নের বছর। ব্যক্তিচরিত্র বদল, আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়নের বছর।

নতুনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। নতুনকে বরণ করে নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। সঙ্গত কারণেই পুরনোকে বিদায় জানিয়েছে নতুন সময় নতুন বছর। নতুনের আবাহন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রতি বছর পহেলা জানুয়ারি আমাদের মধ্যে আসে। আমাদের স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলে। যেমন আসে পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। এ দুটি বিশেষ দিনকেই আমরা বিশেষভাবে বরণ করে নিই। একটির মধ্যে নিহিত রয়েছে আন্তর্জাতিকতা, অন্যটি আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ধারণ করে বাঙালি হৃদয়ে আবর্তিত হয়। নতুন বছরে নতুন দিন আসে, আমরা উদ্দীপিত ও জাগ্রত হই। নতুন জীবনের জয়গান গেয়ে অন্তত ওই দিন উজ্জীবিত হই। উলস্নাসেও ফেটে পড়ি। আনন্দ-উলস্নাসের পাশাপাশি আমরা অঙ্গীকার করি, নতুন বছরে নতুনভাবে চলতে। নতুনভাবে জীবনযাপন করতে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকার এর মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠে। ব্যক্তিচরিত্র বদলেরও অঙ্গীকার করি আমরা। এ সবই বিগত বছরের ভুলত্রম্নটি শুধরে নিয়ে নতুনভাবে, স্বচ্ছ ও সঠিকভাবে পথচলার অঙ্গীকার। পুরনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করে নেয়াই মানুষের সহজাত প্রবণতা। জাতীয় জীবনে অধিকাংশ কাজই খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জি মনে করা হলেও খ্রিষ্টীয় বর্ষ ঘটা করে পালন করা হয় না। তবে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে বছরটি কেমন গেল তার হিসাবনিকাশ সবাই করে থাকেন। আমাদের জাতীয় জীবনে ২০১৯ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। নানা ক্ষেত্রে উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে পার হয়েছে বছরটি। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সবার চেষ্টা ছিল এগিয়ে যাওয়ার। নতুনের মধ্যেই নিহিত থাকে অমিত সম্ভাবনার নতুন আশাবাদ। আর সেই আশা ও সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সুযোগ করে দেবে নতুন বছর ২০২০। নতুন বছরে আমরা পুরনো ক্ষত, বেদনা ও ব্যর্থতা ভুলে নতুনভাবে স্বপ্ন দেখি। নতুনভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।

বিদায়ী বছরের বেশ কটি ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল। এর অন্যতম পেঁয়াজ। পেঁয়াজের উচ্চমূল্যের কারণে দেশবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছে। বাজারে পেঁয়াজের প্রচুর সরবরাহ তারপরেও বারবার দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। পেঁয়াজের বাজারে কারসাজির কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। এখনো পেঁয়াজের বাজার সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। ওই সময়ে সিন্ডিকেট কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে- যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ছাড়াও ক্যাসিনো কান্ড, বালিশকান্ড, গুজবে গণপিটুনি, মহামারি আকারে ডেঙ্গু (শতাধিক মানুষের মৃতু্য), বায়ুদূষণ, অগ্নিকান্ডের ঘটনা, ছাত্রলীগের অপকর্ম, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান এবং সর্ব শেষ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ ২০১৯ সালের আলোচিত ঘটনা। নানা ঘটন-অঘটন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উতরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে গেল গত বছরটি। ২০১৯ সালেও কমেনি সড়ক দুর্ঘটনা। থামেনি মৃতু্যর মিছিল। সড়ক দুর্ঘটনা প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট কারণ। সে হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা পরোক্ষভাবে হত্যারই শিকার হন। কিন্তু হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জনাকাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ নেই বাংলাদেশে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা না কমে জ্যামিতিক হারেই বেড়ে চলছে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে না, যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে না। রাস্তায় নামলেই মৃতু্যদূত তাড়া করছে যাত্রী বা পথচারীকে। প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় রক্তাক্ত হচ্ছেন, ছিন্নভিন্ন লাশে পরিণত হচ্ছেন।

ব্যাংক খাতে কেলেঙ্কারি ও অনিয়মের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে- যা দেশের আর্থিক খাতকে চরম হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দেশের পুঁজিবাজার শত চেষ্টাতেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে শিক্ষা খাতে নকল রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

তবে কিছুতেই সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা যায়নি। সামাজিক অবক্ষয় দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করছে। হেন কোনো অপরাধ নেই- যা সমাজে সংঘটিত হচ্ছে না। স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী-স্ত্রীকে, মা-বাবা নিজ সন্তানকে, ভাই ভাইকে অবলীলায় হত্যা করছে। প্রেমের কারণে অর্থ সম্পত্তির লোভে সমাজে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অন্যদিকে হতাশা নিঃসঙ্গতা বঞ্চনা অবিশ্বাস আর অপ্রাপ্তিতে সমাজে আত্মহননের ঘটনাও বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে ছেলে খুন করছে বাবা-মাকে, স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে। অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার নিমিত্তে নিজের সন্তানকে হত্যা পর্যন্ত করছে। পারিবারিক বন্ধন স্নেহ-ভালোবাসা মায়া-মমতা আত্মার টান সবই যেন আজ স্বার্থ আর লোভের কাছে তুচ্ছ। এর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছে দেশের কোমলমতি শিশুরা। দিনের পর দিন এই নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়েই চলছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়ে সমাজ আজ থরথর করে কাঁপছে। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মাত্রা ২০১৯ সালেও ব্যাপকহারে ছিল।

আমরা গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার কথা বলি, কিন্তু গণতন্ত্রচর্চা করি না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি গণতন্ত্রচর্চা না থাকে, তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে কী করে। প্রত্যাশা করছি, নতুন বছর হোক গণতন্ত্রচর্চার বছর, অর্থনৈতিক উন্নয়নের বছর। ব্যক্তিচরিত্র বদল, আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়নের বছর।

নতুন বছরে নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি হয়, আবার উবে যায়। আবার সম্ভাবনা তৈরি হয়, আবার উবে যায়। এই তৈরি হওয়া এবং উবে যাওয়ার মধ্যেই আমাদের দিনযাপন- বেঁচে থাকা। আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, জঙ্গিবাদমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। যে বাংলাদেশের জন্য বাঙালি এত সংগ্রাম, সাধনা ও আত্মত্যাগ করেছে, রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছে, একাত্তরে ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, লাখ লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছে। এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, এত রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়া।

দেশের উন্নয়ন যেমন সাধারণ মানুষকে আশান্বিত, আপস্নুত করে, মানুষের কর্মস্পৃহা বাড়ায়- তেমন ব্যর্থতাও গ্রাস করে। বাংলাদেশের জনগণের শান্তি নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নের রূপকার হিসেবে শেখ হাসিনা বিশ্বখ্যাত হোক এই প্রত্যাশা করা অসঙ্গত নয়। কারণ একমাত্র তিনিই বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী নারী সরকারপ্রধান নারী শাসক। আগামী দিনগুলো সমৃদ্ধি বয়ে আনুক জাতির জীবনে। নতুন বছরে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন সুখ ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক সরকারের কর্মোদ্দীপনায়। দেশ ও জাতির সুনাম আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আরও বিস্তার লাভ করুক এ প্রত্যাশা আমাদের। আমরা চাই, সরকার জনগণের প্রত্যাশা, আবেগ ও অনুভূতিকে যথাযথ মূল্যায়ন করে দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। দেশ ও জাতির মঙ্গলে সবার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত দেশপ্রেম জাগ্রত হোক, খুলে যাক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

বিদায়ী বছর আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের বছর। বরগুনায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা এবং বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে- যা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। ডাকসুর ভিপি নুরের ওপর বারবার হামলাও বিদায়ী বছরের আলোচিত ঘটনা। নিরুত্তাপ ছিল দেশের রাজনীতি। রাজপথে ও আন্দোলনে বিএনপি সক্রিয় না থাকার কারণে রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো উলেস্নখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি। আর জাতীয় পার্টির কথাতো বলাই বাহুল্য। প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা দেশের কয়েকজন গুণী ব্যক্তিকে হারিয়েছি- যা গভীর বেদনাবহ। আমরা হারিয়েছি কবি আল মাহমুদ, মোজাফফর আহমদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ, ফজলে হাসান আবেদ, মমমতাজউদদীন আহমদ, সৈয়দ আশরাফ হোসেন, সাদেক হোসেন খোকা, সুবীর নন্দী ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে।

বছরের শেষ দিকে নিরাপদ সড়ক আইন কার্যকর এবং দেশজুড়ে নানান উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনাও সরকারের অন্যতম সাফল্য। এ ছাড়াও চাঞ্চল্যকর মামলা দ্রম্নত শেষের নজির স্থাপিত হয়েছে। পদ্মা সেতুর ২০তম স্প্যান বসেছে বছরের শেষদিন ৩১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। এ ছাড়া এখন থেকে প্রতি মাসে তিনটি করে স্প্যান বসবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মেট্রোরেলের কাজও দ্রম্নত গতিতে এগিয়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্ণফুলী টানেলের কাজ ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের 'সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম' এর আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিভিন্ন রকম ভাতা ও শিক্ষা-উপবৃত্তি পাচ্ছেন ৭৯ লাখ ২৫ হাজার দুস্থ ও অসহায় মানুষ। এর মধ্যে ৪৪ লাখ বয়স্ক মানুষ এবং ১৭ লাখ বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীকে নিয়মিতভাবে জনপ্রতি মাসিক ৫শ টাকা হারে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এসবই সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ।

আওয়ামী লীগের ২১তম কাউন্সিলও দেশবাসীর নজর কেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, এ জন্য তাকে অভিনন্দন। প্রত্যাশা করছি, তিনি দলকে ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আগামী দিনগুলো সমৃদ্ধি বয়ে আনুক জাতির জীবনে।

নতুন বছরে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন সুখ ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক। নতুনভাবে সরকারের কর্মোদ্দীপনায়, দেশ ও জাতির সুনাম আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আরও বিস্তার লাভ করুক এ প্রত্যাশা আমাদের।

সালাম সালেহ উদদীন: কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে