মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

সিনিয়রদের চোখে জুনিয়রদের গান

ম মাতিয়ার রাফায়েল
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
শিল্প-সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্র বা গান যা-ই হোক, যারা নতুন সবাইকে প্রবীণদের হাত ধরেই আসতে হয়। প্রবীণদের কাজগুলো দেখে, অনুসরণ করে আসতে হয়। তবে প্রবীণদের কেউই চিরকাল থাকবেন না। নতুনরাই প্রবীণদের কাজগুলো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এটাই শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও বাস্তবতা। এ কারণে নতুনদের কে কেমন করছেন প্রবীণদের সবাই কমবেশি চোখ রাখেন। গানের শিল্পী হলে গায়ক-গায়িকাদের দিকে নাটক-চলচ্চিত্রের শিল্পী হলে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিকে। নাটক-চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ তত সমৃদ্ধ না হলেও বাংলা গান তার আপন সুর ও বৈচিত্র্যে এত সমৃদ্ধ যে তা গুনে শেষ করা যাবে না। এ গানে অনেক খ্যাতিমান গায়ক-গায়িকা ও গীতিকার-সুরকার এসেছেন যারা বহু কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। একজন শিল্পীর গান গাওয়ার উদ্দেশ্য শুধু শ্রোতাকে বিনোদন দেয়াই নয়, গানটির মধ্য দিয়ে যুগ যুগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকাও তার মনস্কামনায় থাকে। সেদিক থেকে বর্তমানে নতুনদের গান কোন দিকে যাচ্ছে- সেটা প্রবীণ শিল্পীদের দৃষ্টি নিশ্চয় এড়িয়ে যাওয়ার নয়। প্রত্যেকেই চোখ রাখছেন নতুনদের কে কেমন গাইছেন। কোথায় তাদের ঘাটতি, ত্রম্নটি-বিচু্যতি রয়েছে। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন ঘরানার খ্যাতিমান অনেক শিল্পীর সঙ্গে কথা হয়। তাতে দেখা যায় বেশিরভাগ প্রবীণ শিল্পীই নতুনদের গানে খুব বেশি উচ্চাশা করতে পারছেন না। তাদের প্রায় সবাই একই বাক্যে মানছেন নতুনরা অতিমাত্রায় আত্মপ্রচারকামী। যে কারণে তারা গানের গুণগত মানের দিকে চোখ রাখার সময়ই দেয় না। এ প্রসঙ্গে বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী মনে করেন, এখনকার শিল্পীরা যেন 'একটা নতুন কিছু করো, একটা নতুন কিছু করো' এই বিজ্ঞাপনের প্রতি এতটাই মশগুল যে, 'নতুন' বলতে তারা আসলে কী বোঝাতে চায় এটা তাদের গানে খুঁজে পাওয়াটাই মুশকিল। ফলে পুরো গান দিয়ে নয় বরং তাতে দু'একটা শব্দ দিয়ে চমক সৃষ্টি করতে চায়। 'কিন্তু চকচক করলেই তো সোনা হয় না'। তাই নতুনদের গান হচ্ছে এই 'চমকের গান'। নতুনদের গান সম্পর্কে সৈয়দ আবদুল হাদী তেমনটিই মনে করেন। বিশিষ্ট পেস্ন-ব্যাক কণ্ঠশিল্পী খুরশীদ আলমের কাছে নতুনদের গান সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, 'নিরান্নব্বই শতাংশ শিল্পীই দেশের বাইরে সেটেল্ড হওয়ার চিন্তায় থাকেন। প্রায় সবারই গানের চেয়েও বড় একটা ধান্ধা থাকে কীভাবে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, দুবাই প্রভৃতি দেশে স্থায়ী হওয়া যায়। তবে তারা অবশ্যই মেধাবী। কিন্তু তা হলেও তারা গানের বিষয়ে জোর না দিয়ে বরং বিলাসবহুল জীবনটার দিকটাতেই অত্যন্ত বেশি জোর দেন। আমাদের সময়ে একটা গানের জন্য দু'চারদিন সময় লাগত এখন একদিনেই সব হয়ে যায়।' নতুনদের গান কেমন মনে করছেন এমন কথায় বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী ফরিদা পারভীন বলেন, 'কোথায়, কাউকেই দেখছি না তো। গলাটা ভালো হলেই তো হবে না। প্রথমত ডেডিকেটেড হতে হবে। দ্বিতীয়ত সঠিক গুরু ধরে শিখতে হবে। ওদের অভিভাবকরা লোভীও। তারা টাকার কাছে বিকিয়ে যাচ্ছে। ফলে গানের প্রতি তাদের ভালোবাসাটা থাকছে না। এখন প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সব প্রেমহীন সমাজ হয়ে গেছে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে ঐ ডিজিটাল আমার দরকার নেই।' অন্যদিকে কোকিলকণ্ঠীখ্যাত সাবিনা ইয়াসমিন অনেকটা খেদের সঙ্গেই বলেন, 'নতুনদের গান আমি একেবারেই শুনি না। শুনেও কোনো লাভ নেই। ভালোও লাগে না। তারা কেমন গাইবে আবার, যে গান কারো মনেই থাকে না, সে গান আবার কেমন হবে?' অর্থাৎ নতুনদের গানের প্রতি সাবিনা ইয়াসমীন এতটাই বিরক্ত যে, তাদের গান শোনার ব্যাপারে তার কখনো আগ্রহও জাগে না। বাংলাদেশের কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা। তিনি সেদিকে না গিয়ে বলেন, 'আমি নতুনদের গান সব সময়েই মনোযোগ দিয়ে শুনি। টিভির কোনো লাইভ প্রোগ্রামে কারো গান ভালো লাগলে সঙ্গে সঙ্গেই আমি ফোন দিই। গানের ভালো-মন্দ বিষয়ে কিছু টিপসও দিয়ে থাকি। কারণ আমি জানি এতে শিল্পীরা উৎসাহিত হবে আরও ভালো গান গাওয়ার জন্য।' বিরহ গানের আলোচিত শিল্পী মনির খান বলেন, 'আগে যারা গান করতেন সৃষ্টির ওপর প্রাধান্য দিতেন। এখনকার শিল্পীরা প্রাধান্য দেন সময়ের ওপর। আগে যেটা সৃষ্টি হতো সেটা যেন যে কোনো সময়ের জন্যই আধুনিক হয় সে দিকটাতেই লক্ষ থাকত। এখন ভালো লাগার দিকে নয়, সময় কী চায় সেটাতেই প্রাধান্য দিচ্ছে।' নব্বই দশকের অন্যতম কণ্ঠশিল্পী রবি চৌধুরী বলেন, 'নতুনরা তো আসবেই। আমরাও তো নতুন ছিলাম। কিন্তু নতুনরা এমন যে মিডিয়া তাদের একটু খোঁজ নিলেই নিজেদের মহা তারকা হিসেবে ভাব ধরে। আমরাও তো দর্শক-শ্রোতা ও মিডিয়ার প্রশংসা পেয়েছি কিন্তু এ নিয়ে আমরা কখনো গর্ব ও অহংকার করিনি। আগের শিল্পীরা গানে মেলোডিকে গুরুত্ব দিতেন বেশি আমরাও সেভাবেই মেলোডিকে গুরুত্ব দিয়েছি। মেলোডি ছাড়া কেউই গানে চিরস্থায়ী হতে পারবে না। নতুনদেরও তাই করতে হবে।' রবি চৌধুরী মনে করেন, বাংলা গানের যে মৌলিকতা মেলোডি, সেই মেলোডি থেকেই নতুন শিল্পীরা দূরে সরে যাচ্ছে। তারা মেলোডির বদলে চটুল গানেই ঝুঁকছে বেশি। রবি চৌধুরী আরও বলেন, চটুল গান আগেও হয়েছে, এন্ড্রু কিশোরের মতো বড় গায়কও অনেক চটুল গান করেছেন কিন্তু তার মেলোডি গানই প্রচুর। আবার রুনা লায়লা প্রচুর চটুল গান করেছেন সেই তিনিও মেলোডি গান করেছেন। কিন্তু এখনকার তরুণরা যেন ভাইরাল হওয়ার জন্যই একতরফা চটুল গান করে যাচ্ছে। 'এজন্য তাদের গানের স্থায়িত্বও কম। কথায় ভালো-মন্দ যা-ই থাকুক সুরে বৈচিত্র্য থাকে না। ঘুরেফিরে একই সুর আসছে।' একই সময়ের আরেক সঙ্গীত শিল্পী সেকান্দার বাদশা বুলবুল বলেন, 'আসলে আমাদের সময়ের গানে যে মাদকতা ও মনমানসিকতা ছিল, প্রাণ ছিল, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও মমত্ব ছিল- এখনকার গানে এর কোনোটাই নেই। সে কারণে ভালো কোনো গানও হচ্ছে না। যারা গাইছে, তারা ধুমধাম করে আসে আবার হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। মিডিয়াও কিছুদিন তাদের নিয়ে হৈ চৈ করে তারপর চুপ হয়ে যায়।'
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে