logo
রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২ আশ্বিন ১৪২৭

  হাসান মোলস্না/ফয়সাল খান   ০৮ আগস্ট ২০২০, ০০:০০  

কোভিড-১৯ এ মৃতু্য-আক্রান্ত

রাজনৈতিক অঙ্গনে করোনার 'ছোবল'

মৃতু্য ও আক্রান্তের সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এর সঠিক পরিসংখ্যানও রাখতে পারেনি। জুলাইয়ে বিএনপি নেতাকর্মীর মৃতু্য শতাধিক ছাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগে এর সংখ্যা আরও বেশি

সামাজিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকসহ প্রায় সবপর্যায়ে রয়েছে করোনাভাইরাসের ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব। আর রাজনৈতিক অঙ্গনে লেগেছে বড় ধাক্কা। মৃতু্য ও আক্রান্তের সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এর সঠিক পরিসংখ্যানও রাখতে পারেনি। জুলাইয়ে বিএনপি নেতাকর্মীর মৃতু্য শতাধিক ছাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগে এর সংখ্যা আরও বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ এক প্রকার বন্ধ। এমনকি দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনসহ দাপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রেও শিথিলতা দেখা গেছে। ত্রাণ বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি ছাড়া অনেকটাই সংবাদ সম্মেলন আর ভিডিও বার্তা নির্ভর কর্মকান্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। কর্মকান্ড সীমিত করলেও করোনার থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অসংখ্য নেতাকর্মী। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন অনেকেই।

তবে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যারা জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন, দল বা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারের জন্য দৃশ্যমান কিছু করা হয়নি। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় নেতারা প্রথমদিকে নিহত কর্মীদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন। তাছাড়া করোনাভাইরাসে প্রাণ হারানো নেতাকর্মীদের পাশে থাকার ঘোষণাও দিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা।

আওয়ামী লীগ : করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৪ দলের মুখপাত্র ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুলস্নাহ, সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ও ঢাকা-৫ আসনের সাবেক সাংসদ হাবিবুর রহমান মোলস্না। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ২৮ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সভাপতি বেলায়েত হোসেন খান, গোপালগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. আহসান সিকদার, সাতক্ষীরা পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও রেডক্রিসেন্ট ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার রাজপাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সেলিম রেজা, বৌলতলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মাহামুদ আলম, চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রহমান, সীতাকুন্ড পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ শাহ আলম, ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুলফিকুল সিদ্দিকী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী মো. আফজাল হোসেন নিসার, জামালপুরের সরিষাবাড়ী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবলুর রহমান, বগুড়ার আওয়ামী লীগ নেতা মামুনুর রশিদ সরদার, চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ফেরদৌস আরা সুন্না, সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার আমুড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরুল হক আকন্দ, নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার নরোত্তমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আফছার রতন, ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ রওশন আলী, মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থসম্পাদক আবদুল মহি লাল্টু, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মাহমুদুর রহমান, ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পিকু আহসান হাসিব, জয়পুরহাটে আওয়ামী লীগ নেতা মামুন সরদার, বরগুনার আওয়ামী লীগ নেতা জিএম দেলোয়ার, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শাহীন চৌধুরী, কুমিলস্না মহানগর আওয়ামী লীগের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের অর্থ সম্পাদক আবুল বাশার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ি ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী এবং করোনার কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলরপ্রার্থী মো. হোসেন মুরাদ। শ্রীমঙ্গল পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল আহাদ, কবিরহাট পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন ও কালিয়াকৈর পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজেরা বেগম এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুলস্না আওয়ামী লীগ নেতা গিয়াস উদ্দিনসহ অনেক নেতাকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

তাছাড়া আরও অনেক মন্ত্রী-এমপি, দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বেশ কয়েকজন মেয়র-কাউন্সিলর ও রাজনৈতিক নেতা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং, যশোর-৪ আসনের সাংসদ রণজিৎ কুমার রায়, চট্টগ্রাম-৮ আসনের মোসলেম উদ্দিন, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান, জামালপুর-২ আসনের ফরিদুল হক খান দুলাল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের এবাদুল করিম বুলবুল, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, নওগাঁ-২ আসনের শহীদুজ্জামান সরকার, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপস্নব বড়ুয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদের করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসা গ্রহণ শেষে তারা এখন সুস্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য ও সাবেক সাংসদ সানজিদা খানম করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

কুমিলস্না সদর উপজেলার চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম টুটুল ও কুমিলস্না সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী মাহাবুব, যুবলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও নরসিংদীর শিবপুর এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (এনসিসি) ও ৪, ৫, ৬নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

গফরগাঁও পৌরসভার মেয়র এসএম ইকবাল হোসেন সুমন, পটুয়াখালী পৌরসভার মেয়র মহিউদ্দিন আহমেদ, দাউদকান্দি পৌরসভার মেয়র নাইম ইউসুফ, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মমুজিবুর রহমান, চান্দনাইশ পৌরসভার মেয়র মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম, চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার মেয়র মো. মিজানুর রহমান, ভেরামারা পৌরসভার মেয়র শামিমুল ইসলাম সামা ও মীরকাদিম পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম শাহীন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। করোনা আক্রান্ত পৌর মেয়রদের প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, করোনা প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া ও সহায়তা করার জন্য ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। যে কারণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাসহ বহু নেতাকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যারা মারা গেছেন তারা জনগণের পাশে থেকে কাজ করছিলেন এবং তা করতে গিয়েই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

বিএনপি : করোনাভাইরাসের থাবা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রেখে জনগণের পাশে দাঁড়াতে শুরু থেকেই নির্দেশনা ছিল বিএনপির হাইকমান্ডের। নির্দেশনা পালনে দলের নেতাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও দল সমর্থিত চিকিৎসকরা ছিলেন খুবই তৎপর। মাঠপর্যায়ে ত্রাণ বিতরণসহ জনমুখী বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করতে গিয়ে দলের অনেক নেতাকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, গত মাস থেকে এর সঠিক পরিসংখ্যানও রাখতে পারেনি দলটি।

জুন শেষে বিএনপির দপ্তর থেকে দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান হচ্ছে, ৭৩ নেতাকর্মী মারা গেছেন। আর এ সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন ২৮৪ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ জন, মারা গিয়েছেন ১৪ জন। কুমিলস্না বিভাগে আক্রান্ত ৫২ জন, মৃতু্য ১৯ জন। ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত ১০১ জন, মৃতু্য ৩৬ জন। ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত ১০ জন, মৃতু্য একজন। খুলনা বিভাগে আক্রান্ত ৩০ জন। সিলেট বিভাগে আক্রান্ত ২১ জন, মৃতু্য দুইজন এবং ফরিদপুর বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ জন, মারা গেছেন একজন।

সর্বশেষ পরিসংখ্যানের তথ্য জানাতে গিয়ে গতকালের দলের সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, এখন আক্রান্তের সংখ্যা এত বেড়েছে যে, সঠিক পরিসংখ্যান রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। গত ২৩ জুলাইয়ের সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে, মৃতু্য ১২০ আর আক্রান্ত সহস্রাধিক। মৃতু্য হওয়া উলেস্নখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এম হক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আউয়াল খান, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসান উলস্নাহ হাসান, ওলামা দল নেতা দ্বীন মোহম্মদ কাশেমী।

করোনায় দলীয় প্রভাবের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, করোনা সংকট তৈরি হওয়ার পর শুরু থেকেই ইতোমধ্যে বিএনপির অনেক নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যদের কাছে নেতারা গিয়ে তাদের খোঁজখবর নিয়েছেন। সর্বশেষ ঈদের দিন দলীয় চেয়ারপারসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে কথা হয়েছে, তাদের পরিবার-পরিজনদের নিয়ে কথা হয়েছে।

মির্জা ফখরুল দাবি করে বলেন, মৃতু্য ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজ থেমে নেই বিএনপির। সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ অংশগ্রহণে অসহায় ও দুস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। শুধু গত ২০ মার্চ থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত সর্বমোট ৫৪ লাখ ১২ হাজার ৪১৬টি পরিবারকে সহযোগিতা করা হয়। এ সহযোগিতার আওতায় মোট ২ কোটি ১৬ লাখ ৪৯ হাজার ৬৬৪ জন মানুষ উপকৃত হয়েছেন। এছাড়া ড্যাব, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন ও দলের নেতাদের কয়েক লাখ মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান ও পিপিই বিতরণ করেছেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে