টুঙ্গিপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী

সব আমলেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন

পদ্মা সেতুতে মা-বোনের সঙ্গে উচ্ছ্বসিত জয় গোপালগঞ্জ থেকে দুই ঘণ্টায় গণভবনে
সব আমলেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, 'আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, এরশাদ, জিয়াসহ সব আমলেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। কিন্তু শত নির্যাতনের মধ্য দিয়েও আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে সব সময় শক্তিশালী ছিল। বিশেষ করে আমাদের মাঠকর্মীরা সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারাই কিন্তু দলকে ধরে রেখেছেন।'

সোমবার নিজের জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলের নেতাকর্মীকে নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি। এর আগে তিনি নবনির্মিত টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আওয়ামী লীগ ছাড়া আর যে দলগুলো বাংলাদেশে ক্ষমতায় গেছে, তারা দেশবাসীর জন্য কোনো কাজ করেনি। পঁচাত্তরের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা ক্ষমতায় এসেছে 'খাওয়া পার্টি' হিসেবে, দেওয়ার জন্য নয়। আর আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকে মানুষকে দিয়ে যাচ্ছে, মানুষের জন্য করে যাচ্ছে।'

দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, 'জাতির পিতা কিন্তু নিজের জন্য দল করেন নাই বা নিজের ক্ষমতার লোভে দল করা বা নিজের অর্থ-সম্পদ বানানোর জন্য

করেন নাই। তিনি করেছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য। কাজেই আমার যেটুকু আছে, আমি যে একটা গরিব মানুষকে দিতে পারি, আর সে যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, এটাই তো আমার সার্থকতা একজন নেতা হিসেবে। আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে সেই আদর্শ মেনেই চলতে হবে।'

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সোমবারই প্রথম গোপালগঞ্জে পৈত্রিক ভিটায় যান শেখ হাসিনা। দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা হোসেন পুতুলকে নিয়ে সড়ক পথে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়েই যান তিনি।

টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছে জাতির পিতার কবর জিয়ারত করেন শেখ হাসিনা। পরে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন।

দক্ষিণ জনপদের উন্নয়নে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে নানা বাধা মোকাবিলার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।

পদ্মা সেতু পাড়ি দেওয়ার এই যাত্রায় ছোটবোন শেখ রেহানাকেও আনার ইচ্ছা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, 'কারণ এই পদ্মা সেতু বানাতে গিয়ে আমাদের ওপর যে অত্যাচার...আপনারা চিন্তাও করতে পারবেন না। মিথ্যা একটা অভিযোগ এনেছিল। আমার ছেলেমেয়ে, রেহানার ছেলে, রেহানা থেকে শুরু করে আমার মন্ত্রী, সচিব মোশাররফ, আমাদের উপদেষ্টা মসিউর রহমান সাহেব থেকে শুরু করে এদের ওপর একেবারে জুলুম। মিথ্যা মামলা দেবে, তাদের হয়রানি করবে।'

নিজে কোনো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন না দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি দুর্নীতি করব কিসের জন্য, কার জন্য?'

নিজের দুই সন্তান এবং ছোট বোনের তিন সন্তান নিজেদের যোগ্যতায় নিজেরা জীবিকা নির্বাহ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, 'তারা কোনোদিনই আমি আজকে চার-চারবার ক্ষমতায় কই কেউ তো আমাকে বলেনি আমায় এই চাকরি দাও, আমায় এই ব্যবসা দাও, এটা দাও, সেটা দাও। নিজেরা চাকরি করছে, নিজেরা পড়েছে, স্টুডেন্ট লোন নিয়েছে, একটা করে কাজ করেছে আবার চাকরি করছে। সেই টাকা শোধ দিচ্ছে আবার পড়েছে।'

ছোটবোনকে নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, 'রেহানাও চাকরি করে খায়। বোন প্রধানমন্ত্রী দেখে একেবারে বোনের ওপর কোনো চাপ দেবে, তাও তো করে না। কোনোদিন কোনো কথা বলে না। বাসে ঝুলে ঝুলে অফিস করে। তারপর সে নিজে কাজ করে খায়। ঘরের কাজ...সে ঘর ঝাড় দেওয়া, বাথরুম ধোয়া, কাপড় ধোয়া, সব নিজেকেই করতে হয়। রেহানা নিজেই করে সব। আমাদের এই আত্মমর্যাদা বোধটা আছে। কারও কাছে হাত পাতা, কারও মুখাপেক্ষী হওয়া নয়।'

দেশের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, 'একটা স্বাধীন দেশকে কিভাবে উন্নত করতে হবে, তার জন্য সব কাজ করে দিচ্ছি।'

দেশের উন্নয়নে যেসব কাজ করে যাচ্ছে, সেগুলো যেন ভালোমতো হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখার জন্য দলের নেতাকর্মীকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, 'সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল, এই চিন্তা করা যাবে না।'

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বের অর্থনীতিতে যে সংকট নিয়ে এসেছে, তা মোকাবিলার কথা তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা এখনো ভালো আছি। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি যে আমরা ভালো থাকব। কাজেই এখানেও সহযোগিতা করবেন সারা দেশবাসীকে।'

দলের নেতাকর্মীর উদ্দেশে তিনি বলেন, 'কোনো এলাকায় যেন একটা মানুষও গরিব না থাকে, ভিক্ষা করে খেতে না হয়, কষ্ট না পায়। তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীর এটা মাথায় রাখতে হবে যে শুধু আমি খাব, আমি ভালো থাকব, আমি শান-সওকতে থাকব, আর আমার পাড়া-প্রতিবেশী খাবে না, এটা যেন না হয়।'

সম্প্রতি সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রামসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা দেখা দেওয়ায় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'সবাই একযোগে কাজ করতে পেরেছি বলেই কিন্তু আজকে করোনা মোকাবিলা, বন্যা মোকাবিলাসহ যে কোনো অবস্থা আমরা মোকাবিলা করতে পারি।'

মতবিনিময় সভায় শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল এমপি, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খান, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. বাবুল শেখ, সহ-সভাপতি মো. ইলিয়াস হোসেন, উপজেলা চেয়ারম্যান সোলায়মান বিশ্বাস, টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার মেয়র শেখ তোজাম্মেল হক টুটুল, কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ভবেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক আয়নাল হোসেন শেখ, উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল বিশ্বাসসহ টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতারা ছিলেন।

দুপুর পৌনে ১২টায় প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতির পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। এরপর তিনি সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার মহান স্থপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। এ সময় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী ছেলে জয় ও মেয়ে পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে পবিত্র ফাতেহা পাঠ, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের শহীদ সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। এ ছাড়া মোনাজাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু, দেশের অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।

এর আগে সকালে গণভবন থেকে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে সড়কপথে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৮টা ৪৮ মিনিটে মাওয়া টোল পস্নাজায় পদ্মা সেতুর টোল দিয়ে তিনি সেতুতে ওঠেন। সেতুর মাঝামাঝি গিয়ে সন্তানদের নিয়ে কিছু সময় পার করেন তিনি। সোয়া ৯টায় তিনি জাজিরা প্রান্তে যান। সেখানে সেতুর উদ্বোধনী ফলকের সামনে কিছু সময় দাঁড়ান। এরপর বিশ্রাম নেন জাজিরা প্রান্তের সার্ভিস এরিয়া-২ এ। এদিকে, যাত্রাপথে পদ্মা সেতুতে দাঁড়িয়ে একটি সেলফি তুলেছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। সজীব ওয়াজেদ জয় ছবিটি তার ফেসবুক পেজে শেয়ার করেছেন।

উদ্বোধনের পর পদ্মা সেতু দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় এটিই প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রথম সফর। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকাজুড়ে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। টুঙ্গিপাড়া সেজে ওঠে বর্ণিল সাজে। নেতাকর্মীর মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা দেয়। পরে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে টুঙ্গিপাড়া ত্যাগ করেন। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে দুই ঘণ্টায় ঢাকায় গণভবনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেলা সাড়ে ৪টায় গণভবনে পৌঁছান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে