logo
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৬

  আবু নাছের মঞ্জু, স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী   ০৭ জুন ২০২০, ০০:০০  

সাক্ষাৎকার

জনগণের সুরক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি

'নানা রকম মানবিক উদ্যোগের ফলে পুলিশ বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ বেড়েছে'

জনগণের সুরক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি
মো. আলমগীর হোসেন পুলিশ সুপার, নোয়াখালী
নোয়াখালী জেলায় করোনা পরিস্থিতিতে সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে জীবন বাজি রেখে কাজ করে চলেছে পুলিশ বাহিনী। পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা জনসাধারণকে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধিসহ সরকারি নির্দেশনাগুলো মেনে চলার বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির দাফন, সৎকার, সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ, হতদরিদ্র, কর্মহীন এবং সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে থাকা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে খাদ্য সহায়তা প্রদানসহ নানা রকম মানবিক উদ্যোগের ফলে পুলিশ বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ বেড়েছে। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এসব কাজ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন স্থানে ৫২ জন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। লকডাউন করা হয়েছে দুটি পুলিশ ফাঁড়ি। এরপরও থেমে নেই দুর্যোগের এই দুর্গম পথে পুলিশের সাহসী সৈনিকদের পথচলা। জেলা পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন এই যুদ্ধে সম্মুখভাগে থেকে পুলিশ সদস্যদের সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা ও সাহস জুগিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে 'টিমস্পিড' ধরে রেখে পেশাগত দায়িত্ব পালন এবং জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা অর্জনের বিষয়ে তিনি কথা বলেন আমাদের নোয়াখালীর এ স্টাফ রিপোর্টারের সঙ্গে।

যাযাদি :করোনা পরিস্থিতিতে নোয়াখালীতে আপনার নেতৃত্বে পুলিশের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন।

এসপি আলমগীর হোসেন : বাংলাদেশে প্রথম গত ৮ মার্চ ইতালিফেরত দুই ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন মর্মে সংবাদ পাওয়া যায়। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ এবং অদ্যাবধি ভাইরাসটির কোনো প্রতিষেধক কিংবা ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভাইরাসটির সংক্রমণ এবং বিস্তার রোধে সামাজিক/শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি সর্বসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করি। এর মধ্যে উলেস্নখযোগ হচ্ছে-

১. সব উপজেলায় নিজ এবং সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জদের উদ্যোগে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, নিজ নিজ এলাকার জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি পুলিশিং সদস্য এবং গ্রাম পুলিশদের মাধ্যমে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করি।

২. জেলার সব থানার অফিসার ইনচার্জসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ফোকাল পয়েন্ট, করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জরুরি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কুইক রেসপন্স টিম গঠন করি। এসবি ঢাকা থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী বিদেশ প্রত্যাগত প্রবাসীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করি, যা এখনো চলমান রয়েছে।

যাযাদি : করোনা পরিস্থিতিতে নোয়াখালীতে পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।

এসপি আলমগীর হোসেন : করোনা পরিস্থিতিতে নোয়াখালীতে আমাদের অপারেশনাল কার্যক্রমের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে-

১. গত ১১ এপ্রিল করোনার সংক্রমণ বিস্তার রোধে জেলা প্রশাসক কর্তৃক নোয়াখালী জেলাকে অবরুদ্ধ (লকডাউন) ঘোষণা করা হয়। লকডাউন নিশ্চিতকরণে জরুরি সেবার আওতাধীন যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চলাচল ব্যতিরেকে রাস্তাঘাট, হাটবাজারে সর্বসাধারণের অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রধান প্রধান সড়কে পুলিশি টহল জোরদার করি।

২. অন্য জেলার সীমান্তবর্তী থানায় বাইরের জেলা থেকে জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে স্থায়ী পুলিশি চেক পোস্ট স্থাপনসহ গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করি। এতে বাইরের জেলা থেকে নোয়াখালী জেলায় জনগণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হয়।

৩. হাটবাজারে জনসাধারণের সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকল্পে জেলা এবং সব উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ হাটবাজার ও কাঁচাবাজার পুলিশি নিরাপত্তায় উন্মুক্ত জায়গায় স্থানান্তর করা হয়।

৪. সরকারি-বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণে পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি করি। এতে ত্রাণ চুরি, আত্মসাৎ ও কারচুপি নিয়ন্ত্রণে আসে।

\হ

যাযাদি : করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু বলুন।

\হ

এসপি আলমগীর হোসেন : করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষায় গৃহীত বেশকিছু পদক্ষেপের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে-

১. করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সম্মুখ লাইনে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পুলিশ লাইন্স, জেলা গোয়েন্দা শাখা, জেলা বিশেষ শাখা ও ট্রাফিক ইউনিটসহ জেলার সব থানায় জীবাণুনাশক ট্যানেল স্থাপন এবং পিপিই, হ্যান্ড গস্ন্যাভস, আই প্রটেক্টর, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক বিতরণ।

২. জেলার বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি গ্রহণসহ পুলিশ সদস্য এবং সেবাগ্রহীতাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং প্রতিটি থানার প্রবেশ মুখে হাত ধোয়ার বেসিন, জীবাণুনাশক স্প্রের ব্যবস্থা।

৩. পুলিশ সদস্যদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সুস্থতা নিশ্চিতকল্পে ভিটামিন 'সি' ও 'ডি' এবং জিংক ট্যাবলেটসহ হোমিওপ্যাথিক ওষুধ বিতরণ।

৪. পুলিশ সদস্যদের মাঝে যাতে সহজেই করোনা ছড়িয়ে পড়তে না পারে এবং কোনো ইউনিটের কার্যক্রম যেন পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায় সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশের সব ইউনিটের পুলিশ সদস্যদের দুটি টিমে বিভক্ত করে তাদের একটি টিম দিয়ে নিরাপত্তা ডিউটি এবং অন্য টিমকে রিজার্ভে রাখা হয়।

যাযাদি :পুলিশ সদস্যদের মনোবল চাঙা রাখার লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু বলুন।

এসপি আলমগীর হোসেন : দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পুষ্টিকর ও আমিষ জাতীয় খাদ্য অর্থাৎ দুধ, ডিম, কলা, খেজুর, মাছ, মাংস ইত্যাদি সন্নিবেশিত করি। পুষ্টিকর ও আমিষ জাতীয় খাবারের জন্য বিভিন্ন ইউনিটে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করি। পুলিশ সুপার হিসেবে নিজে প্রতিটি ইউনিট পরিদর্শনপূর্বক পুলিশের সব স্তরের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভাসহ তাদের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর রাখি। করোনায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখার লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করি। এই কমিটি পুলিশ হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, তাদের জন্য ফলমূল সরবরাহ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার সরবরাহ করে থাকেন। রমজান মাস এবং পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে খাদ্য তালিকায় বাড়তি মেনু সংযোজন করি। এতে অফিসার ও ফোর্সের মধ্যে ব্যাপক সন্তুষ্টি বিরাজ করে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী পুলিশ লাইন্স এবং ব্যারাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, পুলিশ লাইন্সের পরিত্যক্ত জমিতে সবজি চাষ, মাছ চাষ, বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা যেমন থানা, ফাঁড়ি, তদন্তকেন্দ্রের পতিত জমি ও জলাশয়ে সবজি এবং মাছ চাষের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া প্রতিনিয়ত পুলিশ লাইন্সে শারীরিক অনুশীলন ও ব্যায়ামের ব্যবস্থা করা হয়।

যাযাদি :আপনার গৃহীত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।

এসপি আলমগীর হোসেন : পুলিশ সুপারের অর্থায়নে কোয়ারেন্টিনকালীন স্বাভাবিক কর্মহীন হয়ে পড়া দুস্থ, অসহায়, প্রতিবন্ধী, সুবিধাবঞ্চিত (বেদে, হিজড়া, ভিক্ষুক) সম্প্রদায়, অসহায় পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা, কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত পুলিশ পরিবার ও অসহায় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিবার, প্রবাসী পরিবার, উপকূলবর্তী নদীভাঙনের ফলে বাস্তুচু্যত পরিবার, টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাপার্সন, কর্মহীন ফুল ব্যবসায়ী/কর্মচারী এবং ভিডিও ব্যবসায়ী/কর্মচারীদের মাঝে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করি। এছাড়া রমজান মাসে এতিম শিশুদের মাঝে ইফতারসামগ্রী বিতরণ করি।

১. এছাড়া করোনায় আক্রান্ত বিভিন্ন রোগীর বাসায় প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, ফলমূল এবং পোশাক ইত্যাদি পৌঁছে দেওয়া অব্যাহত রয়েছে।

২. সোনাইমুড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে করোনা রোগীর সেবায় কর্মরত চিকিৎসক আসমা আক্তারকে ভাড়া বাসা থেকে বাড়ির মালিক বের করে দেয় খবর পেয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপে পুনরায় তাকে ওই বাসায় সসম্মানে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

৩. চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত বেগমগঞ্জ উপজেলার কুলছুম আক্তার (৪৫) নামে এক নারী করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার পর নিজ গ্রামে লাশ দাফনের জন্য আনা হলে এলাকাবাসীর প্রবল বাধার মুখে পড়ে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে মৃত ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন করা হয়।

৪. কবিরহাট থানার রোজিনা (৩৫) নামে এক প্রসূতির জরুরি সিজারের প্রয়োজন হলে পুলিশ পিকআপ দিয়ে তাকে হাসপাতালে প্রেরণ করে।

৫. ঢাকায় করোনা উপসর্গ নিয়ে কবিরহাট উপজেলার মহিউদ্দিন ফারুক (৪৯) নামে এক ব্যাংকার মারা যাওয়ার পর নিজ গ্রামে লাশ দাফনে এলাকাবাসী বাধা সৃষ্টি করে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে দাফন সম্পন্ন হয়।

\হ

যাযাদি : আপনাদের এতসব কর্মকান্ডের পরও নোয়াখালীতে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী?

এসপি আলমগীর হোসেন : মূলত বাণিজ্যিক শহর চৌমুহনীতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ লোকজনের অসচেতনতার কারণে পুরো জেলায় করোনার সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী করোনার তথ্য গোপন করার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে চলে যায়। আমাদের পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক জীবন বাজি রেখে কাজ করার পরও ব্যবসায়ী এবং সাধারণ লোকজনের খামখেয়ালিপনার কারণে আজ সবাইকে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এ পর্যন্ত আমার ৫২ জন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। চৌমুহনী ও সোনাপুর পুলিশ ফাঁড়ি লকডাউন করতে হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে দোকানপাট খুলেছে। এদের বুঝিয়ে, সতর্ক করে, এমনকি জরিমানা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। কেউ নিজেকে, নিজের পরিবার এবং জেলাবাসীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেললে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একার পক্ষে কতটুকু কী করার আছে! তবুও হাল ছেড়ে না দিয়ে জনসাধারণের সুরক্ষায় আমরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে