বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লিচুর ভালো ফলনে চাষীদের মুখে হাসি 

স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
  ০৫ জুন ২০২৩, ১৭:০৮
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লিচুর ভালো ফলনে চাষীদের মুখে হাসি 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলতি মৌসুমে লিচুর ভালো ফলন হয়েছে। ইতিমধ্যেই বাজারে লিচু বেচা-বিক্রি একেবারে শেষ পর্যায়ে। বাজারে লিচুর ভালো দাম হওয়ায় চাষীদের মুখেও চওড়া হাসি।

এদিকে লিচু পাকতে শুরু করায় ও বাগানগুলোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই জেলা শহরসহ দূর-দূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ গিয়ে লিচু বাগানে ভীড় করছেন। লিচু বাগানে তারা প্রিয়জনদের সাথে সেলফি তুলছেন। ফেরার সময় কিনে নিয়ে আসছেন লিচু।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ৫৬৭ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ করা হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলাতেই লিচুর আবাদ হলেও ভারতীয় সীমান্তঘেষা বিজয়নগর উপজেলা, কসবা উপজেলা ও আখাউড়া উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ করা হয়। শুধুমাত্র বিজয়নগর উপজেলাতেই ৪৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ করা হয়েছে। বিজয়নগর উপজেলার লিচু মিষ্টি ও রসালো হওয়ায় দেশজুড়ে রয়েছে এই লিচুর আলাদা কদর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২ সাল থেকে বিজয়নগর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ করা শুরু হয়। কম পরিশ্রমে বেশী লাভ হওয়ায় এখানকার ধানি জমিগুলোকেও লিচু বাগানে পরিনত করতে থাকেন চাষীরা।

বর্তমানে উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, খাটিঙ্গা, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, আদমপুর, কালাছড়া, মেরাশানী, সেজামুড়া, কামালমোড়া, নুরপুর, হরষপুর, মুকুন্দপুর, নোয়াগাঁও, অলিপুর, চান্দপুর, কাশিনগর, ছতুরপুর, রূপা, শান্তামোড়া, কামালপুর, কচুয়ামোড়া, ভিটিদাউপুর এলাকায় প্রায় চার শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে দেশী লিচু, এলাচি লিচু, চায়না লিচু, পাটনাই লিচু ও বোম্বাই লিচু চাষ করা হয়।

এছাড়াও উপজেলার প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতেই একটি লিচু গাছ আছে। যাদের বাড়িতে একটু জায়গা আছে, তারা প্রত্যেকেই বাড়িতে অন্যান্য ফলের গাছের সাথে লিচু গাছ লাগান।

এলাকাবাসী ও চাষীরা জানান, লিচু গাছে মুকুল আসার পর থেকে কয়েক দফা বাগান বিক্রি হয়। গাছে মুকুল ও গুটি আসার পর প্রথমে বাগান কিনেন স্থানীয় ও বিভিন্ন জেলার মহাজনরা। গুটি একটু বড় হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় গাছ বিক্রি হয়। লিচু আকার ধারণ করলে তৃতীয় দফায় বিক্রি হয়।

লিচু বড় হলে চতুর্থ দফায় দফায় বাগান বিক্রি হয়। বিজয়নগর উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচুর বাজার হচ্ছে আউলিয়া বাজার। এছাড়া উপজেলার মেরাশানী, মুকুন্দপুর, কাংকইরা বাজার, চম্পকনগর, সিঙ্গারবিল বাজার, আমতলী বাজারসহ আরো কয়েকটি বাজারে পাইকারীভাবে লিচু বেচা-কেনা হয়। প্রতিদিন ভোর রাত ৪টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এসব বাজারে লিচু বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন উপজেলার আউলিয়া বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে প্রায় ২০/২২ লাখ টাকার লিচু বেচা-কেনা হয়।

এসব বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া. কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, ফেনী ও রাজধানী ঢাকার ব্যবসায়ীরা লিচু কিনে বিভিন্ন যানবাহনে করে নিয়ে যায়। বাজার গুলোতে বর্তমানে প্রতি হাজার দেশী লিচু ২ হাজার টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা, প্রতি হাজার এলাচি ও চায়না লিচু ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা, পাটনাই ও বোম্বাই লিচু ২ হাজার ২০০ থেকে ২৫০০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

উপজেলার কামালমুড়া গ্রামের মোঃ শাহাবুদ্দিন বলেন, তার বাগানে ৭০ টি লিচু গাছ আছে। এ বছর লিচুর ভালো ফলন হয়েছে। তিনি ৫ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

উপজেলার সেজামুড়া গ্রামের বাগান মালিক কাউছার ভূইয়া বলেন, তার ৪টি বাগানে ১৭০টি গাছ আছে। এ বছর লিচুর ভালো হয়েছে। ইতিমধেই লিচু বিক্রি শুরু করেছেন। তিনি আশা করছেন এ বছর তিনি প্রায় ১২ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে পারবেন।

উপজেলার মহেশপুর গ্রামের লিচুর চাষী মাসুদুল হাসান বলেন, এ বছর আবহাওয়া একটু বিরূপ ছিলো। বৃষ্টি হলে আরো ভালো ফলন হতো। তিনি বলেন, তার বাগানে ৬০টা গাছ আছে। লিচু আবাদ করতে তার ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি ৬ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

উপজেলার কামালমুড়া গ্রামের লিচুর চাষী শফিকুল ইসলাম বলেন, তার দুইটা বাগানে ৬০ গাছ আছে। গত ১০/১২দিন ধরে তিনি বাজারে লিচু বিক্রি করছেন। তিনিও প্রায় ৫ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার লিচুর পাইকার দুলাল মিয়া বলেন, গত ৫ দিন ধরে তিনি বিজয়নগর আসছেন। প্রতিদিনই তিনি গড়ে প্রায় লাখ টাকার লিচু কিনে নিয়ে যান। এখানকার লিচু ভালো ও মিষ্টি হওয়ায় লিচু বিক্রি করে তিনি লাভবান হচ্ছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার লিচুর পাইকার কালু মিয়া বলেন, গত ১৫ দিন ধরে তিনি আউলিয়া বাজার সহ বিভিন্ন বাগান থেকে লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকার উপরে লিচু কিনেন। তিনি বলেন, লিচু বিক্রি করে লাভ একটু কম হলেও বিজয়নগরের লিচুর বাজারে খুব চাহিদা রয়েছে।

এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর,ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মুন্সী তোফায়েল হোসেন বলেন, লিচু আবাদের জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বাগান মালিকদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৫৬৭ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ করা হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলাতেই লিচুর আবাদ হলেও ভারতীয় সীমান্তঘেষা বিজয়নগর উপজেলা, কসবা উপজেলা ও আখাউড়া উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ করা হয়। শুধুমাত্র বিজয়নগর উপজেলাতেই ৪৩০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ বছর জেলাতে প্রায় ২৪ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করা হয় বলে আশা করছি।

যাযাদি/ এম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে