বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে গোলকধাঁধা

বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে গোলকধাঁধা

দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে ১১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হলেও পরিকল্পিত ছক না থাকায় তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই গোলক ধাঁধায় পড়েছেন। তাই বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত সব কার্যক্রমই এলোমেলোভাবে চলেছে। রাস্তাঘাটে সঠিকভাবে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামলেও অতি নগণ্য সংখ্যক পথচারীকে জরিমানা করার মধ্য দিয়ে তা শেষ হয়। রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত, গণপরিবহণ ও রেস্তোরাঁসহ সবখানেই সব ধরনের বিধি-নিষেধ চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। অন্যদিকে উন্মুক্ত স্থানে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সমাবেশ বন্ধ রাখতে বলা হলেও তা আগের তালেই চলেছে। সব ধরনের যানের চালক ও সহকারীদের করোনা টিকা সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও কেউই এসবের পরোয়া করেননি। রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খেতে এবং আবাসিক হোটেলে থাকতে টিকার সনদ প্রদর্শন করার নির্দেশনা থাকলেও কোথাও কেউ তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়েছে বলে শোনা যায়নি। সরকার ঘোষিত ১১ দফা নির্দেশনায় করোনার টিকা এবং বুস্টার ডোজের গতি বাড়াতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রয়োজনীয় প্রচার এবং উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হলেও এ ধরনের কোনো তৎপরতা কোথাও চোখে পড়েনি। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে দেশের করোনা সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কেননা করোনার হটস্পট খোদ রাজধানীতেই বাণিজ্য মেলা, পিঠা উৎসব, রাজনৈতিক সমাবেশ চলছে। ঢাকার উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ষষ্ঠ দফা ইউপি নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটছে। যার সবকিছুই ১১ দফা নির্দেশনার বিপরীত। সংশ্লিষ্টরা জানান, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সব সামাজিক, \হধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমাবেশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা চলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টিকার সনদ দেখিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার নির্দেশনা 'অবাস্তব' বলে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি সাফ জানিয়ে দিয়েছে। কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, বাণিজ্য মেলার মতো জায়গায় কখনোই স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব নয়। তার ভাষ্য, বাণিজ্য মেলাকে আরও সফল করার জন্য, আরও জনসমাগম বাড়ানোর জন্য আয়োজন চলছে- যা ১১ দফা নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন বাণিজ্য মেলা ঘুরে যে চিত্র দেখা গেছে, তাতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা যে অমূলক নয় তা অনেকটাই স্পষ্ট। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা পরিচালনা করার কথা বলা হলেও সেখানকার প্রতিটি স্টলেই ক্রেতাদের গাদাগাদি করে বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটা করতে দেখা গেছে। মেলায় আগতদের বেশিরভাগের মুখে মাস্ক না থাকলেও এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে শোনা যায়নি। এমনকি স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের মুখে মাস্ক পরার ব্যাপারেও মেলা কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি ছিল না। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল যায়যায়দিনকে বলেন, যেকোনো জনসমাবেশ করোনার উৎপত্তিস্থল, এটা আমরা সবাই জানি। ওমিক্রনের সংক্রমণ গতি ডেল্টার তুলনায় পাঁচ থেকে ছয়গুণ বেশি। এর মধ্যে ১১ দফা জারি এবং বর্তমানে দেশের মধ্যে যা চলছে, এই দু'য়ের মধ্যে কোনো মিল নেই। ওমিক্রন ও ডেল্টাসহ যেকোনো ভ্যারিয়েন্ট নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। আর তা না করে যদি কাগুজে ১১ দফা জারি করেই সরকার বসে থাকে, তাতে জাতি আবার ডেল্টার সময়ের মতো ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়বে। এই জনস্বাস্থ্যবিদ অভিযোগের সুরে বলেন, শুধু দেওয়ার জন্যই ১১ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কে বাস্তবায়িত করবে, কে তদারকি করবে- এর কোনটি নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় এসব নির্দেশনা শুধু নথিতেই বন্দি থাকবে। ১১ দফা বাস্তবায়নের জন্য একটা সমন্বিত, সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার, যেটা আগেও হয়নি, এখনো হবে না- বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। সংক্রমক রোগ বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার বে-নজির আহমেদ বলেন, দেশে জোরেশোরে চলছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন; সভা সমাবেশ। জনবহুল নগরী নারায়গঞ্জসহ দেশের হাজারো গ্রামীণ জনপদ প্রচার প্রচারণায় মুখরিত। করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতির পরও নির্বাচন কমিশন স্থানীয় নির্বাচন স্থগিত করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ গাদাগাদি করে ওয়াজ মাহফিল শুনছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অগনিত মানুষ কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে বিয়েসাদিসহ সামাজিক নানা অনুষ্ঠান যোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে টিকাদান কর্মসূচির গতি আগের মতোই ঢিলেতালে চলছে। টিকা প্রদান ১০ কোটির মাইলফলক ছুঁলেও, প্রাধিকার তালিকায় গ্রামীণ নিম্নবিত্ত বয়োবৃদ্ধ, শিশুদের অনেকই এখনো দুই ডোজ এমনকি এক ডোজের সুরক্ষা বলয়েও ঢোকেনি। অথচ তাদের বাদ রেখে গুটিকয়েক শহুরে সুবিধাভোগীদের বুস্টার ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রবীণ এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে প্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের টিকার আওতায় আনা জরুরি। টেনে ধরতে হবে জনসমাগমের লাগাম। সরকারের দেওয়া ১১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে নজরদারি জোরদার করারও তাগিদ দেন তিনি। এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে নগরবাসী সবাই আগের মত গা ছাড়াভাবে চলছে। বেশিরভাগ মানুষের মুখেই মাস্ক নেই। কেউ কেউ আবার তা মুখে, গলায় কিংবা থুতনিতে ঝুঁলিয়ে রেখেছে। অনেকে মাস্ক পকেটে নিয়ে ঘুরছে। ভ্রাম্যমান আদালত দেখলে তাড়াহুড়ো করে তা মুখে লাগাচ্ছে। এদিকে বিবধিনিষেধে সব ধরনের যানবাহনের চালক ও সহকারীদের আবশ্যিকভাবে করোনার টিকা সনদ থাকার কথা বলা হলেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বেশিরভাগ চালক-সহকারী এখনো টিকাই নেননি। সেই সঙ্গে মাস্ক পরতেও তাদের অনীহা দেখা গেছে। রামপুরায় আবাবিল পরিবহণের চালক মুস্তাক হাসান জানান, তিনি করোনার কোনো টিকা এখনো নেননি। মাস দু'য়েক আগে সুরক্ষা অ্যাপসে টিকার নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু টিকা নেওয়ার কোনো খুদে বার্তা পাননি। তবে তার সহকারী মোজাম্মেল এক ডোজ টিকা নিয়েছে। তার কাছে সনদও আছে। \হমুস্তাকের দাবি, গাড়ির চালক ও সহকারীর টিকা সনদ বাধ্যতামূলক করার আগে টিকাদান কর্মসূচি গতিশীল করা জরুরি। যাতে আগ্রহী যে কেউ সহজে টিকা নিতে পারে। তা না হলে এ ধরনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না বলে মনে করেন তিনি। ট্রান্সসিলভা, মেঘলা, মালঞ্চ, বিআরটিসি, ওয়েলকাম, বিকল্প, খাজাবাবা, বসুমতি শিকড়সহ আরও কয়েকটি পরিবহণের বাসের চালক ও সহকারীর সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। তাদের বেশিরভাগই টিকা নিতে আগ্রহী হলেও তা পাননি বলে জানান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

সকল ফিচার

ক্যাম্পাস
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
হাট্টি মা টিম টিম
কৃষি ও সম্ভাবনা
রঙ বেরঙ

Copyright JaiJaiDin ©2022

Design and developed by Orangebd


উপরে