বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
walton1

বাঁশখালী ও দাকোপে বেড়িবাঁধে ভাঙন জাজিরা ও পাইকগাছায় ফসলের ক্ষতি

ম স্বদেশ ডেস্ক
  ২৮ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০
ঘূর্ণিঝড় 'সিত্রাং'য়ের প্রভাবে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অরক্ষিত এবং জলকদর খালের বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রবেশ করছে জোয়ারের পানি। এদিকে খুলনার দাকোপে ১৫টি স্থানে ওয়াপদা বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এছাড়াও শরীয়তপুরের জাজিরা এবং খুলনার পাইকগাছায় জমির ফসলের সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়েছে। বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকার ১৪২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ১৩২ কিলোমিটার অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং ও সমুদ্রের উচ্চ জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের লোনাপানি লোকালয়ে প্রবেশ করে উপকূল রক্ষার বেড়িবাঁধ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এসব বেড়িবাঁধ অরক্ষিত হয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে উপকূলের ৫০ হাজার বাসিন্দা। উপজেলার ছনুয়া, শেখেরখিল, গন্ডামারা, শিলকূপ, সরল, খানখানাবাদ, সাধানপুর, পুকুরিয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। অন্যদিকে ছনুয়া, শেখেরখিল, গন্ডামারা, খানখানাবাদ, উপজেলা এলজিইডি'র কয়েকটি সড়ক ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। এছাড়াও তীরবর্তী বেড়িবাঁধ ভেঙে ছনুয়া, সরল, শেখেরখিল, খানখানাবাদের রায়ছটা, কদমরসুল ও প্রেমাশিয়া, বাহারছড়ার রত্নপুর, মিনজীরিতলা, কাথরিয়ার বাগমারা, গন্ডামারার আলোকদিয়া ও খাটখালী, পশ্চিম ও পূর্ব বড়ঘোনা, সাধনপুরের রাতারখোদ্দ গ্রাম, উপকূলীয় জলকদর খাল সংংগ্ন পুঁইছড়ির ফুটখালী, আরবশাহ্‌ ঘোনা, সরলিয়া ঘোনা, ছনুয়ার মধুখালী, আবাখালী ও খুদুকখালী, চাম্বলের ডেপুটিঘোনা, বাংলা বাজার, শীলকূপের পশ্চিম মনকিচর, শেখেরখিলের সরকার বাজার, ফাঁড়ির মুখ, এবং লালজীবন, ও খানখানাবাদের কদম রসুল গ্রাম পস্নাবিত হয়ে ৭০ ভাগ বসতঘর ডুবে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নে প্রায় ৪ কি.মি বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শেখেরখিল ইউনিয়নে বিভিন্ন পয়েন্টে ১.৫ কি.মি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গন্ডামারায়, ৩ কি.মি, সাধনপুরে ১.৫ কি. মি, চাম্বলে ০.৬৫ কি.মি, সরলে ০.৫০ কি.মি, খানখানাবাদ ১.০০ কি.মি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এসব বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী প্রকাশন চাকমা জানান, ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী সময় উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শন করা হয়েছে। এতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের পুনরায় সংস্কার করা হবে। দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় খুলনার দাকোপের ১৫টি স্থানের ওয়াপদা বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। দ্রম্নত সংস্কার না করলে যে কোনো সময় পানিতে পস্নাবিত হতে পারে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। সরেজমিন দেখা গেছে, নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে অবস্থিত পানখালী ইউনিয়ানের খলিশা, মধ্যপানখালী, জাবেরের খেয়াঘাট, লক্ষ্ণীখোলা, খোনা, তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের গড়খালী, মোজামনগর, ঝালবুনিয়া, দক্ষিণ কামিনিবাসিয়া, উত্তর কামিনিবাসিয়া, বটবুনিয়া, কামারখোলা ইউনিয়নের জালিয়াখালী, ভিটেভাঙ্গা, শ্রীনগর, সুতারখালী ইউনিয়নের কালীবাড়ী, গুনারী, শিবসারপাড়, কালাবগীসহ প্রায় ১৫-২০ স্থানের ওয়াপদা বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইউএনও ঝুঁকিপূর্ণ ওয়াপদা বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া উপজেলার প্রায় ১৬৮টি ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৩ শতাধিক ঘরবাড়ির আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। পানখালী ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ছাব্বির আহমেদ জানান, তার ইউনিয়নে ৫-৭টি স্থানের ওয়াপদা রাস্তায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এছাড়া অন্তত ১০ জনের ঘরবাড়ি ও ১৫টি ছোট মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, দাকোপে ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে অন্তত ১৫-২০টি স্থানের ওয়াপদা বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে এগুলো সংস্কারের চেষ্টা করছি। পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। ইউএনও মিন্টু বিশ্বাস বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্ততি নেওয়া হয়েছে। উদ্ধার টিম ও মেডিকেল টিম মাঠে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে ভাঙন এলাকা সংস্কার করার চেষ্টা চলছে। জাজিরা (শরীয়তপুর) প্রতিনিধি জানান, প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় 'সিত্রাং'র প্রভাবে জাজিরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার শীতকালীন আগাম সবজি চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস ও কয়েকটি এনজিওর তথ্যমতে, শুধুমাত্র জাজিরায় প্রায় ২৩৫ হেক্টরের বেশি করলা, বেগুন, ধুন্দুল, লাউ, শসা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন আগাম শীতকালীন সবজি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ১১৮০ হেক্টর আমন ধান, ১৫ হেক্টর পেঁয়াজ, ২৬ হেক্টর খেসারি ও মসুর, ২২ হেক্টর মরিচ ও ১০ হেক্টর রসুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাজিরা পৌরসভার সোনার দেউল গ্রামের কৃষক লতিফ মোলস্না বলেন, আগাম শীতকালীন সবজি হিসেবে ১০ বিঘা জমিতে করলা, বেগুন, লাউ ও শসার চাষ করেছিলেন। ঘূর্ণিঝড়ে তার সম্পূর্ণ ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গিয়ে ফসল নষ্ট হয়েছে। তিনি এ বছর এসব সবজি চাষে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। এ বিষয়ে এসডিএস এর কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ খাজি আলম বলেন, আমরা আপাতত বিভিন্ন ক্ষেত ঘুরে কৃষকদের অতিরিক্ত পানি ক্ষেত থেকে বের করে দেওয়াসহ পানি শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছি। পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি জানান, সুন্দরবন উপকূলীয় খুলনার পাইকগাছার মানুষের কাছে যেন এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ'। এর কারণ প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে এ জনপদে। বার বার গুঁড়িয়ে দেয় লাখো মানুষের একেকটি সোনালী সকালের স্বপ্নের প্রত্যাশা। তবে সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সুন্দরবন উপকূলীয় খুলনা অঞ্চলের পাইকগাছায় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও বৃষ্টির প্রভাবে জেলার সর্বোচ্চ মাছের ঘের, কাঁচা ঘর-বাড়ি ও কৃষি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় ১১২টি মৎস্য ঘের, ২০৭টি কাঁচা ঘর ও ১৮৭ হেক্টর জমির কৃষি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। তবে উপজেলায় এবারই প্রথম কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুরক্ষিত ছিল ওয়াপদার বেড়িবাঁধগুলো। উপজেলা কৃষি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম জানান, উপজেলায় সর্বমোট প্রায় ১৮৭ হেক্টর জমির কৃষি ফসলের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। যার বেশির ভাগই আমন ফসল। উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা টিপু সুলতান জানান, উপজেলার অন্তত ৮৩ জন চাষির ১১২টি মৎস্য ঘেরের প্রায় ৬.১ মেট্রিকটন মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উপজেলার গড়ুইখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন মৎস্য ঘের তুলনামূলক বেশি ক্ষতি হয়। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৩০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানান, দুর্যোগে আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও কার্যত এর প্রভাব প্রতিফলিত না হওয়ায় সর্বসাধারণ দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়নি। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব কুমার পাল জানান, খুলনার শুধুমাত্র পাইকগাছায় মৎস্য ঘেরের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার ৮৩ জন মৎস্যচাষির ১১২টি ঘেরের ৬.১ মেট্রিকটন মাছের ক্ষতি হয়েছে। ইউএনও মমতাজ বেগম বলেন, সিত্রাং'র আগাম সতর্কবার্তায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে বেশ আগেই সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া দুর্যোগের প্রভাবও কম ছিল তাই জানমালের বিশেষ ক্ষতি হয়নি।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে