শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ৯ মাঘ ১৪২৭

পথ হারিয়ে বস্তিতে ফের অজানা গন্তব্যে

পথ হারিয়ে বস্তিতে ফের অজানা গন্তব্যে
খুশি আরা

২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। ঢাকার একটি বাসা থেকে হঠাৎই নিখোঁজ হয় ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী খুশি আরা। এ ঘটনায় গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেও তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে আদালতে মামলা দায়ের করেন খুশির বাবা আজিজার রহমান। ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হয় দিনাজপুরের খানসামা থানাকে। থানার তদন্তে সন্তুষ্ট হতে না পারায় বাবার আবেদনে দায়িত্ব পায় পিবিআই। তাদের তদন্তেরও সন্তুষ্ট হতে না পারলে শেষে দায়িত্ব পায় সিআইডি। সিআইডিতে মামলাটি এখনও তদন্তাধীন। এরই মাঝে শিশুটিকে গত পহেলা জুলাই উদ্ধার করে গুলশান থানা পুলিশ। এরপরেই শুরু হয় বিপত্তি। মেয়েকে দেখে দৌড়ে পালায় বাবা আজিজার।

পুলিশের দাবি কিছু অর্থের জন্য তিনি এতদিন মামলা লড়েছেন। এখন জীবিত অবস্থায় মেয়ে ফেরত আসায় তাকে আর নিতে চান না আজিজার। উপায় না পেয়ে আদালতের নির্দেশে এখন হতভাগা খুশির ঠিকানা হয়েছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। ফলে শিশুটি যেন আবারও অজানা পথে হারিয়ে যেতে বসেছে। দীর্ঘ ৭ বছর পর খুশির এমন উদ্ধারের ঘটনাটি যেন ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ক্রাইম প্যাট্রোলকেও হার মানিয়েছে।

জানা গেছে, রাজধানীর গুলশানের নিকেতন 'বি' বস্নকের ৯১ ভবনের বাসিন্দা মাসুদুজ্জামান। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর জেলার খানসামা থানার টংবুয়া গ্রামে। বাসায় কাজের জন্য ২০১২ সালের শুরুতে সৈয়দ শুকুর আলী নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে দিনাজপুরের খানসামা থানার গুচ্ছগ্রাম পাকেরহাটের বাসিন্দা আজিজার রহমানের ১১ বছর বয়সি মেয়ে খুশিকে বাসায় নিয়ে আসেন। ভালোভাবেই কাজ করছিল খুশি। অটো রাইস মিলের ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামানের পরিবারের সদস্যরাও তাকে আপন করে নিয়েছিলেন। এভাবে এক বছর পার হয়ে যাওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয় খুশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি পণ্য কেনার জন্য বাসার নিচে নামার পর থেকে সে নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে সন্ধান করে খুশিকে না পেয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন মাসুদুজ্জামান। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকায় নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি ছাপান তিনি। কয়েকদিন ধরে এলাকায় মাইকিং করেও সন্ধান না পেয়ে হাল ছেড়ে দেন মাসুদুজ্জামান। এরই মাঝে দিনাজপুর আদালতে মামলা করেন খুশির বাবা আজিজার। মামলায় আসামি করা হয় মাসুদুজ্জামান ও তার স্ত্রী শওকত আরা বেগম শিউলী, সৈয়দ আলী শাহ ও তার ড্রাইভার খগেন্দ্র নাথ রায়কে। আদালতের নির্দেশে মামলাটি থানায় নথিভুক্ত করে তদন্তভার দেওয়া হয় খানসামা থানাকে। ২০১৪ সালের ওই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে বাদী আজিজার রহমান তাতে নারাজি দেন। এরপর আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। পিবিআইও অধিকতর তদন্ত শেষে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। এতেও সন্তুষ্ট হতে না পেরে বাদী আবারও নারাজি প্রদান করলে আদালত পুনরায় অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিলে বর্তমানে মামলাটি সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে। এভাবে তদন্ত চলার এক পর্যায়ে গত ৩০ জুন গুলশান থানা পুলিশের কাছে খুশির বিষয়ে তথ্য আসে। এরপর পুলিশ জানতে পারেন খুশি বর্তমানে বনানী থানাধীন কড়াইল বস্তিতে বসবাস করছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে পুলিশ গোপনে সব পক্ষের সাথে যোগাযোগ শেষে কড়াইল বস্তিতে বসবাসকারী খুশিই ৭ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া শিশু বলে নিশ্চিত হন। এরপর পহেলা জুলাই মাসুদুজ্জামানের স্ত্রী শওকত আরা বেগম শিউলীকে সাথে নিয়ে খুশিকে উদ্ধার করেন গুলশান থানার এসআই মো. আনোয়ার হোসেন খান। দীর্ঘদিন ধরে খুশি কড়াইলের বউ বাজার বস্তির খোকনের বাসায় বসবাস করে আসছিল। এরপর গুলশান থানার পক্ষ থেকে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুরের এসআই জাবিরুল ইসলামকে জানানো হয়।

গুলশান থানার ইন্সপেক্টর তদন্ত আমিনুল ইসলাম জানান, খুশি আরা জানায়, ঘটনার দিন সে বাসা থেকে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে। এ সময় সে হাঁটতে হাঁটতে গুলশান থানাধীন গুদারাঘাট এলাকায় রাস্তার পাশে গাছের নিচে বসে কাঁদতে থাকে। গুলশান-১ ডিসিসি মার্কেটের ক্লিনার মনোয়ারা বেগম (খোকনের মা) তাকে কাঁদতে দেখে তার নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে খুশি নাম ছাড়া আর কিছুই বলতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে মনোয়ারা বেগম কড়াইল বস্তিতে তার বাসায় নিয়ে যান এবং তিনিই খুশিকে দীর্ঘ ৭ বছর লালনপালন করেন।

খুশি হারিয়ে যাওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুর সিআইডির এসআই জাবিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার পর খুশিকে দিনাজপুরে তার বাবার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু খুশির বাবা তাকে দেখে দৌড়ে পালায়। সে কোনোভাবেই মেয়েকে গ্রহণ করবে না বলে জানায়। এরপর খুশিকে আদালতে তোলা হলে আদালত পরিচয় নিশ্চিত হয়ে এবং সার্বিক দিক বিবেচনায় তাকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠায়। বর্তমানে খুশি সেখানেই অবস্থান করছে।

তিনি বলেন, খুশি হারিয়ে যাওয়ার পর মামলা করে দীর্ঘদিন ধরেই মাসুদুজ্জামানের পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে আসছিলেন আজিজার। এবং মামলা নিষ্পত্তির জন্য মোটা অঙ্কের টাকাও দাবি করছিল। আজিজার ৪টি বিয়ে করেছেন। তার সঙ্গে এখন কেউ বসবাস করে না। একমাত্র ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে। বিয়ের বয়সি মেয়েকে নিয়ে তিনি আর নতুন বিপদে জড়াতে চান বলে ধারণা করা হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে