মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯
walton1

জঙ্গিদের সঙ্গে সাক্ষাতে কড়াকড়ি!

গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে হ ৬৮টি ইউনিটকে শক্তিশালী করা হচ্ছে
গাফফার খান চৌধুরী
  ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০
মৃতু্যদন্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর দেশের কারাগারগুলোতে বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের সঙ্গে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎ। দায়িত্ব পালনের সময় কোনো কারারক্ষীর মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখতে পারবেন না। যাদের কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন্দিদের বেআইনিভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। কারাগারগুলোতে ঘনঘন তলস্নাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর দেশের ৬৮টি কারাগারে রেড এলার্ট জারি রয়েছে। প্রতিটি কারাগারের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটের নেতৃত্বসহ নানা বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগে সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি কারাগারের গোয়েন্দা বিভাগকে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে মনিটরিং করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবেও বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। সূত্রটি জানিয়েছে, প্রতিটি কারারক্ষীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন কারাগারে গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করছেন তাদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তারা বিশেষ কোনো আদর্শে বিশ্বাসী কিনা তাও জানার চেষ্টা চলছে। কারারক্ষীরা দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ধরনের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না। কোনো কারারক্ষী এমন নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্রটি বলছে, দুর্ধর্ষ জঙ্গির সেলের সুবিধাজনক জায়গায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যাতে ওইসব দুর্ধর্ষ বন্দি বা জঙ্গিদের ওপর ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করা যায়। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি কারারক্ষীদের পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। একই সেলে একই কারারক্ষী যাতে বারবার দায়িত্ব পালন না করে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। কারণ অনেক সময়ই একই সেলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলে কারারক্ষী ও বন্দির মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সেই সুসম্পর্কের সুযোগ নিয়ে কোনো কারারক্ষী যাতে বন্দিদের কোনো ধরনের বেআইনি সুযোগ দিতে না পারে। এছাড়া বন্দিও যাতে কোনো ধরনের সুযোগ নিতে না পারে সে বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের সাক্ষাৎ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। মানবিক কারণে কোনো জঙ্গির সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ থাকলেও প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ। কোনো জঙ্গি বা আসামির সঙ্গে কে বা কারা দেখা-সাক্ষাৎ করতে চান তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই জঙ্গির বা বন্দির বিরুদ্ধে কতগুলো এবং কী কী ধরনের মামলা আছে এবং তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সম্পর্কের যাবতীয় তথ্য রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উলেস্নখ করতে বলা হয়েছে। এরপরই কারা কর্তৃপক্ষ ওই জঙ্গি বা বন্দির সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সাক্ষাৎ করার সুযোগ দেবেন কি দেবেন তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন। অনুমতি ছাড়া সাক্ষাৎ করানো যাবে না বলে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা আছে। বন্দি ও সাক্ষাৎ প্রার্থীর যাবতীয় তথ্য কারাগারের ভেতরে কাজ করা প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থাকে অবহিত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব তথ্য কারাগারে থাকা সরকারি রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করতে হবে। জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রম্নয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ময়মনসিংহে নেওয়ার পথে ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় পুলিশের প্রিজনভ্যানে হামলা চালায় জেএমবি সদস্যরা। তারা এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে জেএমবির যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দুর্ধর্ষ জঙ্গি বোমারু মিজান (৩৯), জেএমবির শুরা সদস্য রাকিবুল হাসান (৩৬) ও সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানিকে (৩৮) ছিনিয়ে নেন। ওইদিনই টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে পালানোর সময় রাকিবুল হাসান নিহত হন। বোমারু মিজান ও সানিকে ধরিয়ে দিতে বাংলাদেশ পুলিশ ৫ লাখ করে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। সূত্রটি বলছে, ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে জেএমবির আস্তানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর আলোচনায় আসেন কওসর ওরফে বোমারু মিজান। তাকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) দেশটির বেঙ্গালুরুর মালাপ্পুরাম জেলার কোতাক্কালের একটি আস্তানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। দায়িত্বশীল একজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের তরফ থেকে সম্মিলিতভাবে বোমারু মিজানকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য মতে, বোমারু মিজানের সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অনেক জঙ্গি সংগঠনের যোগাযোগ আছে। তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা কারাগারেই হয়। এরপর ছিনিয়ে নেওয়ার পর তার ভারতে আত্মগোপন করা, সেখানে বোমা তৈরির কারখানা স্থাপন, সেই কারখানায় তৈরি বোমা বাংলাদেশে থাকা জঙ্গিদের কাছে পাঠানোর যাবতীয় পরিকল্পনা সংক্রান্ত নানা তথ্য দেন তিনি। ভারতের আদালত বোমারু মিজানকে ২৯ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রটি বলছে, এমন ঘটনার পর কারাগার অধিদপ্তর, কারাগারের নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগ এবং কারাগারে দায়িত্ব পালনকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এরপর জঙ্গিদের আদালতে পাঠানোর সময় বিশেষ প্রিজনভ্যান চালু, প্রিজনভ্যানে সিসি ক্যামেরা লাগানো, প্রিজনভ্যানের সামনে- পেছনে নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি আসে। বিগত কয়েক বছর এমন কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই জঙ্গিদের কারাগার থেকে আদালতে পাঠানো হয়। সূত্রটি বলছে, দীর্ঘ ৮ বছর পর চলতি বছরের ২০ নভেম্বর গাজীপুরের সেই কাশিমপুর কারাগার থেকেই ১২ দুর্ধর্ষ জঙ্গিকে একটি মামলায় ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়। হাজিরা শেষে আদালত চত্বর থেকে মৃতু্যদন্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মো. মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান (২৪) ও আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে শাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাবকে (৩৩) পুলিশের চোখে পিপার স্প্রে ছিটিয়ে অজ্ঞান এবং মারধর করে ছিনিয়ে নেন তাদের সহযোগীরা। দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। এ ঘটনায় ১০ জঙ্গিকে একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন শাহীন আলম ওরফে কামাল, শাহ আলম ওরফে সালাউদ্দিন, বি এম মজিবুর রহমান, সুমন হোসেন পাটোয়ারী, আরাফাত রহমান, খাইরুল ইসলাম, মোজাম্মেল হোসেন, শেখ আবদুলস্নাহ, আবদুর সবুর ও রশিদ-উন-নবী ভূঁইয়া। চলতি বছরের ২৩ নভেম্বর রাতে জঙ্গি ছিনতাইয়ে সরাসরি অংশ নেওয়া মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফিকে (২৪) গ্রেপ্তার করে তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দারা। রিমান্ডে থাকা এবং ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গির সবাই আনসার আল ইসলামের সদস্য। জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাফি সরাসরি জঙ্গি ছিনতাইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি জঙ্গি সংগঠনটির সামরিক শাখার সদস্য। তিনি বস্নগার নাজিম উদ্দিন সামাদ হত্যায়ও অংশ নিয়েছিলেন। কারাগারেই জঙ্গি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা হয় বলে প্রাথমিকভাবে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছেন। এসব বিষয়ের্ যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন যায়যায়দিনকে বলেন, 'দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।র্ যাব সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণও জঙ্গিবাদ। এখন পর্যন্তর্ যাব প্রায় তিন হাজার জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে। এজন্য স্বাভাবিক কারণেই জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। জঙ্গিদের আদালতে আনা-নেওয়াসহ নানা সংক্রান্ত নানা বিষয়ের্ যাবের গোয়েন্দারা কাজ করছে।'
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপরে